বাংলার মুক্তকন্ঠ; মুক্তচিন্তা হোক মঙ্গলের, সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত।

পুলিশের জন্য বোরকা - প্রসঙ্গ- বর্ষবরণের শুভদিনে অশুভ ঘটনা

পুলিশের জন্য বোরকা
আনোয়ারা সৈয়দ হক


এটা তো আমাদের কাছে নতুন কিছু না যে আমরা এত বেশি বিচলিত হয়ে পড়বো। আমাদের এই দেশটি ধ্বংসের জন্যে সেই গোড়া থেকেই তো ষড়যন্ত্র চলছে। কখনো ছায়ানটের বৈশাখী বটতলায় বোমা মেরে, কখনো উদীচীর অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, কখনো মুক্তচিন্তার মানুষের ঘাড়ে কোপ বসিয়ে, আর সেসব করে যদি কিছু অর্জন না করা যায় তাহলে মেয়েদের আব্রুহানি করে। একের সঙ্গে অন্যের যোগ বড় গভীরে স্থাপিত।
আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়, যে বা যারা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে আগে বাধা সৃষ্টি করত, তারা সব বা তাদের চেলাচামুণ্ডারা এতদিনে একেবারে বাঙালির এই জাতীয় উৎসবটিকে প্রাণের ভেতরে তুলে নিয়েছে! না। প্রমাণ হিসেবে কজন বোরকা পরিহিত মহিলাকে পহেলা বৈশাখে আমরা জনগণের কাতারে শামিল হতে দেখেছি। বা কজন জামায়াত বা হেফাজতকে সেখানে শামিল হতে দেখেছি? বা সকল দেশবাসীর সাথে বছরের প্রথম দিনটিকে উপভোগ করতে দেখেছি। সত্যি বলতে এখন তো দেশের বেশির ভাগ মহিলাই বোরকা পরিহিত। তারা কি সব পহেলা বৈশাখে বোরকা ছেড়ে বটতলায় এসেছেন? না। কেউই আসেননি। বা আমাদের চোখে পড়েনি। তার কারণ বাঙালির এই জাতীয় উৎসবটিকেও তারাও বোরকা পরিয়ে নিজেদের জীবন থেকে বিদায় দিয়েছেন! এবং যেসব বাঙালি নারী এই উৎসবটি পালন করেন তাদের প্রতি এক হিংসাত্দক দৃষ্টি ছুড়ে দিয়েছেন! তারা প্রতীকী হিসেবে ইলিশ মাছও খাননি বা পান্তাভাতেও হাত দেননি।
পুলিশের নাকের ডগায় বাঙালি মেয়েদের শ্লীলতাহানি কি নতুন কিছু ঘটনা? পুলিশের নাকের সামনে চাপাতির কোপ খাওয়া কি আহামরি কিছু? সবকিছু জেনেই না তবে তারা পুলিশ? পুলিশের ভেতরে কতজন এই বাঙালির উৎসবকে ঘৃণা করে তার কোনো সমীক্ষা কি কোনোদিন কেউ করতে পেরেছে? করতে সাহস পেয়েছে? না। কখনো কি মনে হয়েছে পুলিশও পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ঘৃণা করে? এতে তাদের পাপ বোধ হয়? তাদের ধর্মহানি হয়? এবং মেয়েরা বোরকা না পরলে তারা মনে মনে ক্রুদ্ধ হয়? যতই তাদের পুলিশ বাহিনীতে মেয়েদের সম্পৃক্ততা থাকুক না কেন?
পুলিশ বাহিনীতে যখন লোক নিয়োগ করা হয়, তখন কি তাদের সাইকোলজিক্যাল টেস্ট করা হয়? তাদের ভেতরে দেশপ্রেম, ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা, এসব কিছু পরীক্ষা করা হয় বা হয়েছে কোনোদিন? না।
এইসব পুলিশেরা কোথা থেকে আসেন। তাদের আদি পরিচয় কি? দেশের কৃষ্টি সংস্কৃতির সাথে তাদের কতটুকু চেনাজানা? সমীক্ষা করলে দেখা যাবে এসবের কিছুই তাদের ভেতরে নেই। বা থাকলেও ছিটেফোঁটা আছে। সাধারণ মানুষের ভেতরে যতসব কুসংস্কার তাদের ভেতরেও সেরকমই সবকিছু বহাল তবিয়তে আছে। পুলিশ হিসেবে দীক্ষা নেওয়ার জন্যে তাদের ভেতরে কোনোকিছুরই পরিবর্তন সাধিত হয়নি। কারণ যা না হয় নয় তে, তা নব্বইতেও হয় না। তবু চেষ্টা থাকে। সে চেষ্টাও তাদের দিয়ে কেউ কোনোদিন করাননি। বা করানোর প্রয়োজন বোধ করেননি।
এর জন্যে বিপ্লবী মানসিকতার সরকার লাগে। এর জন্যে কামাল আতাতুর্ক হতে হয়।
তারপরও একথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে যে আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনী স্কটল্যান্ডের পুলিশ বাহিনীর চেয়ে কোনো অংশে কম মেধাসম্পন্ন বা কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নয়। কোনোদিন ছিল না। এ দেশের রাজনীতি বা বিনারাজনীতি সংক্রান্ত যে কোনো ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটি সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল। বড় গভীরভাবে ওয়াকিবহাল। তবু তাদের এ ধরনের আনাড়িপনা ব্যবহারের পেছনে গভীর এক কারণ আছে, যা আমরা জনগণ জানি না বা বুঝতে পারি না। শুধু এইটুকু বুঝি যে আমাদের দেশের পুলিশ একটি সম্পূর্ণ পৃথক সাইকিক অস্তিত্বের অধিকারী। তারা কোনো সরকারের কব্জায় নয়, যদিও তাদের ব্যবহার দেখে মনে হয় তারা সবসময় সরকারের কব্জার ভেতরে। তাদের নিজস্ব একটি আইন-কানুন আছে, আর তা হলো ধরি মাছ, না ছুঁই পানি। আমরা মেয়েরা বাজি রেখে বলতে পারি, এই ঘটনা যদি বিএনপির আমলে ঘটত, তাহলেও পুলিশের ভূমিকা এর চেয়ে পৃথক কিছু হতো না। আমরা মেয়েরা কি বিএনপি আমলে বইমেলার ঘটনার কথা বেমালুম ভুলে গেছি? তখন কি পুলিশ বাহিনীর কর্মতৎপরতার কথা ভুলে গেছি? না।
এই দেশটি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে, যে যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিল পরীক্ষিতভাবে স্বাধীনতাবিরোধী, স্বাধীনতা অর্জনের পর পর তারা কি একেবারে দেশপ্রেমিক হয়ে গেছে? তা কি হওয়া সম্ভব? 'আমাদের মিঠু ভুল বুঝিল এবং তাহার পর হইতে সঠিক পথে চলিল?' এরকম কি কখনো হতে পারে? না। অথচ হওয়া উচিত ছিল। মাত্র তেইশ বছরের পাকিস্তান আমলের কথা আজ পঁয়তাল্লিশ বছর পর্যন্ত স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি দেশে থেকেও কিছু মানুষ ভুলতে পারল না। এবং তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় জেনারেশনও ভুলতে পারল না। এর কারণ কি? এর কারণ কি শুধুই ধর্ম? না। এর কারণ আমরা সকলেই জানি।
এ যাবৎ তাদের মানসিক রাজ্যের গঠন প্রক্রিয়ার ওপর কোনো সমীক্ষা চালানো হয়েছে কি? তারা তো মুক্তিযুদ্ধের পর পর বেশ বহাল তবিয়তে এদেশে থেকে গেছে। কেউ কেউ ভুয়া মুক্তিযুদ্ধের সনদও গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছে। তাতে ফল হলো কি? তাদের সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের খবর কি? এক বিষবৃক্ষ যে কেবল মাত্র অগণিত বিষবৃক্ষের জন্ম দেয়, সেটা কি আমরা জানি না? তার প্রমাণ তো আমরা হরহামেশাই চোখে দেখছি।
আমরা সবই জানি, শুধু মুখ মুছে ভালো মানুষটি হয়ে থাকি। কারণ আমরা ভয় পাই। কারণ চোখ বুজে থাকা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে।
এই যে এতবড় দুটো ক্রিকেট খেলা হলো এবং এই যে আমাদের দামাল ছেলেরা পাকিস্তানিদের গোহারা হারালো, কতজন এদেশবাসী তার জন্যে কত মন খারাপ করেছে তা কি কেউ জানে? তারা কি জানে, পাকিস্তান হেরে গেছে বলে সেদিন তারা রাতের খানা খায়নি! খেলার আগে নামাজের পাটিতে বসে পাকিস্তানি ছেলেদের জন্যে দোয়া দরুদ পড়েছে, তার খবর কেউ কি রাখে?
অবশ্যই রাখে। কিন্তু আমরা চোখ বুজে থাকতে ভালোবাসি। কারণ চোখ খুললেই আমাদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। আমরা এখনও খোলা চোখে স্বীকার করতে পারিনে যে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমাদের দেশ থেকে না রাজাকার, না আলবদর, না বিহারি, কাউকে উচ্ছেদ করতে পারিনি। বরং আরও আদর করে পেলে পুষে রেখেছি।
কতজনকে ফাঁসিতে চড়াবে দেশের সরকার? চোখের সামনে যারা তারা তো মুষ্টিমেয়। তারা যে হাজার হাজার তাদের রক্তবাহিত পোষ্যদের রেখে দিয়ে যাচ্ছে, তাদের কি হবে?। এমনকি তাদের সন্তান সন্ততিদের ভেতরেও আজ পর্যন্ত কেউ কি তাদের পূর্বপুরুষের খারাপ কৃতকর্মের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে? না। এর মানে কি? এর মানে হচ্ছে তারা যে পাকিস্তান চোখেও দেখেনি, যে পাকিস্তানিদের বর্বরতার শিকার জীবনেও হয়নি, সেই পাকিস্তানে বিশ্বাস করে। পারলে পাকিস্তানি ভাইকে এখনই ডেকে এনে বাংলার মসনদে চড়িয়ে দেয়!
এবং সেজন্যে স্বাধীনতার শুরু থেকে একদল হয়ে গেছে বাঙালি পন্থি আরেকদল পাকিস্তানি পন্থি। তারা দুই ধারার রাজনীতি করে। আমাদের দেশের জন্মের কিছুদিন পর থেকেই এই দেশে দুই ধারার রাজনীতি। যারা পাকিস্তানি পন্থি তাদের শানশওকত ধন-সম্পদ সব কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার জন্যেই, কিন্তু তবু তারা পাকিস্তানি কারণ রিয়েল পাকিস্তানিরা এদেশ ছাড়ার সময় তাদের পাকিস্তানি দীক্ষায় দীক্ষিত করে দিয়ে গেছে। যাকে বলে ব্রেইন ওয়াশ। এবং সেই সূত্রে তাদের সন্তান সন্ততি নাতি নাতকুর এমনকি তাদের বাড়ির কাজের মানুষজন পর্যন্ত ব্রেইন ওয়াশ। তাদের জীবনেও কোনোদিন অর্থের অভাব হবে না, কারণ তার জন্যে তাদের পাকিস্তানি ভাইবেরাদররা আছেন। তাদের হার্টের অসুখ হলে তারা করাচি বা লাহোরে দৌড়ে চলে যান, বিনা পয়সায় হার্টের অপারেশন করেন। পাকিস্তানের অনেক সংস্থার সাথে গভীর তাদের যোগাযোগ। কিন্তু এসব সারা হয় গোপনে। আমরা হয়ত ভাবতে পারি এরা সব মারা গেলে আর আমাদের চিন্তা নেই। কিন্তু তা কি করে হবে? এদের অগুনতি সন্তান সন্ততি আছে না? তারা পাকিস্তানের সুবিধাও নেবে আবার বাংলাদেশের সুবিধাও নেবে।
আমরা বুঝতে পারলাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছেলেমেয়েরা ক্ষুব্ধ হয়ে শাহবাগ থানার পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করেছে। এটা অত্যন্ত খারাপ একটি কাজ। শুধু তাই না, ঘেরাও করে আবার থানার পুলিশ ভাইদের হাতের চুড়ি আর পরিধানের শাড়ি উপহার দিতে চেয়েছে। কতবড় দুঃসাহসের কথা।
একবার শুনেছিলাম আমাদের দেশের একজন বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিবিদের বাড়ি ঘেরাও করে অসহায় জনগণ তার বাড়ির চারপাশে গণপেসাবে শামিল হয়েছিল।
সেই হিসাবে চিন্তা করলে এটা পুলিশ ভাইদের জন্যে খুবই ভালো একটা উপহার ছিল। বস্তুত এ উপহারের তুলনা নেই। তবে এর সাথে যদি একটা করে বোরকা উপহার দিতেন তাহলে আরও ভালো হতো। বোরকা পরে এরপর থেকে পুলিশ ভাইরা ডিউটি দেবেন। শুধু চোখ দুটো খোলা রাখবেন, যেন বিড়ি সিগারেট ধরাতে গিয়ে বোরকায় আগুন না ধরিয়ে দেন। কারণ প্রায় আমরা রাস্তা দিয়ে চলার সময় তাদের মাঝে মাঝে সিগারেটে টান দিতে দেখি।
এরপর যদি আমাদের দেশে কোনো পহেলা বৈশাখ হয়, হবে তো অবশ্যই, মৃত্যু হলেও হবে, শ্লীলতাহানি হলেও হবে, বার বার করে নারীর শ্লীলতাহানি হলেও হবে, তখন আমাদের অনুরোধ যেন বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের পুলিশ বাহিনীর কোনো সহায়তা না নেন, বরং শাহবাগ থেকে পুলিশ ফাঁড়িটাকে সযত্নে সরিয়ে ফেলেন। কারণ আমাদের দেশের পুলিশ ভাইয়েরা বড়ই কর্মক্লান্ত। তাদের ছোটাছুটির অন্ত নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন সেদিন দাবাখেলা বন্ধ রেখে আত্দত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত দেখিয়ে নিজেদের স্কোয়াড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে তৈরি করে নেন। আমি হলফ করে বলতে পারি সেই স্কোয়াড আমাদের কর্মক্লান্ত পুলিশ ভাইদের চেয়ে হাজারগুণে শ্রেষ্ঠ হবে। পুলিশ ভাইয়েরা সেদিন পান্তা ইলিশ খেয়ে নতুন কোনো থানার অভ্যন্তরে পহেলা বৈশাখ পালন করবেন। এবং জনগণের আনন্দের সাথে শামিল হবেন।
তারপরও কথা থাকে, আর সেটা হলো এই লেখাটির মূল এবং মোদ্দা কথা, আর সেই মোদ্দা কথাটা হলো পুরুষের খাসলত। নারী দেখলে যেসব পুরুষের ভেতরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, নারী লাঞ্ছনার ভেতর দিয়ে যেসব পুরুষের বীর্যপাত ঘটে, অর্থাৎ যারা সব তেঁতুললোভী পুরুষ, তাদের ব্যাপারে নারীরা লা জওয়াব!
২০/৪/২০১৫
লেখক : কথাসাহিত্যিক।

- See more at:

http://www.bd-pratidin.com/editorial/2015/04/22/76471#sthash.KvZVxBZw.dpuf
0 Komentar untuk "পুলিশের জন্য বোরকা - প্রসঙ্গ- বর্ষবরণের শুভদিনে অশুভ ঘটনা"

KANGLA ONLINE

Copy Protected by Surozeet Kumar Singha.

ONLINE RADIO 1

FM Radio of Bangladesh

RADIO 3

RADIO 4

BREAKING NEWS

Back To Top