ফিল্মিস্টাইলে
ব্যাংক ডাকাতি
|
দিনদুপুরে ব্যাংকে ঢুকে ম্যানেজারসহ সাতজনকে
গুলি ও কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ডাকাত নিহত
|
সাভার ও আশুলিয়া প্রতিনিধি
![]() |
| কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া বাজার শাখার রক্তাক্ত মেঝে -বাংলাদেশ প্রতিদিন |
ঢাকার
অদূরে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া বাজার শাখায়
ফিল্মিস্টাইলে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ভরদুপুরে কর্মচঞ্চল ওই এলাকায় সশস্ত্র ডাকাতদের
বর্বরোচিত এ হামলায় ব্যাংকের ম্যানেজার, নিরাপত্তাকর্মী, ব্যবসায়ী, এলাকাবাসীসহ
সাতজন নিহত হয়েছেন। পরে অবশ্য গণপিটুনিতে এক ডাকাত সদস্যের মৃত্যু হয়। গতকাল দুপুর
আড়াইটার দিকে কাঠগড়া বাজার এলাকায় নজিমুদ্দিন সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায়
অবস্থিত ব্যাংকে এ ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা ব্যাংকের ম্যানেজার ওয়ালিউল্লাহসহ অন্য
কর্মকর্তাদের গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা লুট করে। এর
মধ্যে ৬ লাখ টাকা, ডাকাতদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও পাঁচটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড
উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করেছে চার ডাকাতকে। নিহতরা হলেন ব্যাংকের ম্যানেজার
ওয়ালিউল্লাহ (৪৫), গ্রাহক ব্যবসায়ী পলাশ (৪৮), নিরাপত্তাকর্মী বদরুল (৩৮), মুদি
দোকানদার মনির হোসেন (৫৫), মার্কেটের ক্রোকারিজের দোকানি জিল্লুর রহমান (৪০),
এলাকাবাসী জমির উদ্দিন ও নুর মোহাম্মদ। এ ছাড়া ডাকাতের হামলায় গুরুতর আহত ১১ জনকে
সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত ব্যাংক ম্যানেজারের বাড়ি
জামালপুরে। তিনি সাভার আড়াপাড়ায় বসবাস করতেন। অন্যদিকে ডাকাতি করে পালানোর সময় এক
ডাকাতকে ধরে গণধোলাই দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের পরিচালক নাজিমুদ্দিন আটজন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডাকাতদলের তাণ্ডবে
গোটা এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তারা মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে, ককটেল
ও গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভবন মালিক মোস্তাফিজুর
রহমান বরকত জানান, ব্যাংকে ডাকাত পড়েছে এমন খবর শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। গিয়ে
দেখেন ব্যাংকের ভিতরে তাজা রক্ত আর রক্ত। অচেতন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন ম্যানেজার
ও নিরাপত্তাকর্মী। গুলিবিদ্ধ ও কোপানো অবস্থায় আরও ১০-১৫ জন মেঝেতে শুয়ে বাঁচাও বাঁচাও
বলে চিৎকার করছেন। অন্যদের সহযোগিতায় দ্রুত তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।ব্যাংকের
ক্যাশ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, গ্রাহকবেশে কয়েকজন ডাকাত ব্যাংকের ভিতরে প্রবেশের
পর ব্যবস্থাপক ওয়ালিউল্লাহকে গ্রেনেড ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ভল্টের চাবি দাবি করে। তিনি
চাবি দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ডাকাতরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গুলি করে ক্যাশে থাকা প্রায়
৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়।প্রত্যক্ষদর্শী আবুল কালাম জানান, বিকাল ৩টার দিকে মাইক্রোবাস
ও মোটরসাইকেল যোগে ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাতদল ব্যাংকে প্রবেশ করে। ভিতর থেকে
গুলির শব্দ এবং মানুষের আর্তচিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ডাকাতির বিষয়টি নিশ্চিত হন।
পরে পাশের মসজিদ থেকে ব্যাংকে ডাকাত পড়েছে বলে মাইকিং করা হলে চারদিক থেকে বাজারের
ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে ডাকাতদের ঘিরে ফেলেন। এ সময় ডাকাতরা এলোপাতাড়ি
গুলি ছুড়লে ব্যাংকের সামনেই মারা যান মুদি দোকানদার মনির হোসেন, পলাশ ও ওয়ার্কশপ মালিক
জিল্লুর রহমান। বিক্ষুব্ধ জনতা গুলি উপেক্ষা করে ডাকাতদের ধাওয়া দিলে মোটরসাইকেলসহ
ধরা পড়েন এক ডাকাত। ঘটনাস্থলেই গণপিটুনিতে মারা যান তিনি। অন্যদিকে ডাকাতি করে মোটরসাইকেলযোগে
টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় কাঠগড়া বাজার এলাকার পাশের আমতলা এলাকার জিরাবো-বিশমাইল
সড়ক থেকে ডাকাত দলের এক সদস্য ও দুর্গাপুর এলাকা থেকে দুই সদস্যকে আটক করে এলাকাবাসী।
খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ডাকাতদলের অন্য সদস্যকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর
সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় উত্তেজিত এলাকাবাসী পুলিশের দুটি গাড়িতে ভাঙচুর চালায়। পরে
অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আহত ডাকাতদলের এক সদস্যকে উদ্ধার করে
এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
(ওসি) মোস্তফা কামাল ব্যাংকের ম্যানেজারসহ আটজন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ছাড়াও
ঘটনাস্থল থেকে র্যাব সদস্যরা অবিস্ফোরিত পাঁচটি ককটেল ও কয়েকটি গ্রেনেড উদ্ধার করেন।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানান, ১০-১৫ জনের একটি ডাকাতদল বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্র
নিয়ে ডাকাতির উদ্দেশ্যে ব্যাংকে যায়। পরে তারা ওই ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে অস্ত্রের
মুখে জিম্মি করে প্রায় ৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ব্যাংক কর্মকর্তারা
বাধা দিলে ডাকাতরা ম্যানেজার ওয়ালিউল্লাহসহ পাঁচজনকে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার
চেষ্টা করে। ডাকাতদলের সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে ১০টি
চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চলছে। গ্রেফতার হওয়া চার ডাকাত সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।কান্নায়
ভাসছে এনাম হাসপাতাল : চারদিকেই স্বজনদের আহাজারি। কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে গোটা হাসপাতালের
পরিবেশ। একজনের অস্ত্রোপচার শেষ হওয়ার আগেই আরেক জনকে নেওয়া হচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের
সামনে। আর প্রিয় স্বজনকে ফিরে পেতে কান্নার সাগরে ভাসছে স্বজনরা। গতকাল বিকাল
থেকেই পুরো এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিরাজ করছে এ করুণ চিত্র। এর আগে বিকাল ৩টায়
আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতদের গুলি ও বোমায় নিহত হয়েছে
৮ জন। এ ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা চলছে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
অপারেশন থিয়েটারের চিত্রটাই বেশি করুণ। কারো পা উড়ে গেছে বোমার আঘাতে, কারো বুকে ঢুকেছে
গুলি। ব্যথায় ছটফট করা মানুষকে বাঁচাতে প্রাণপণে চেষ্টা চালাচ্ছে চিকিৎসকরাও। অপারেশন
শেষে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে গুরুতর আহত ১৬ জনকে। ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে গুলি ও
বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন এরা।চিকিৎসাধীন কাঠগড়া বাজারের একটি কাপড়ের দোকানের
বিক্রয়কর্মী রফিক বলেন, দুপুরের খাবার শেষে দোকান খোলার জন্য বাজারে আসছিলাম
। এমন সময় মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয় ডাকাতির ঘটনা। যে যার মতো লাঠিসোঁটা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
ব্যাংকের সামনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ডাকাতরা গুলি ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। যে
ব্যক্তিই এগিয়ে গেছে তার প্রতিই গুলি চালিয়েছে ডাকাতরা। ডাকাতের ছোড়া একটি গুলি আমার
পায়ে লাগে। এরপর আর বলতে পারি না। কাউন্টার থেকে টাকা তুলছিলেন ব্যবসায়ী পারভেজ
হোসেন। ভিতরে ঢুকেই সবাইকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করতে থাকে ডাকাতরা। কেউ বাধা দেওয়ার
সাহস পায়নি। ডাকাতরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমার আঘাতে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন তিনি। সার্জারি
বিভাগের চিকিৎসক ডা. কাজী সোহেল ইকবাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আহত হওয়া প্রায় প্রতিটি
রোগীর অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। এদের কারো পা ও হাত কেটে ফেলতে হয়েছে।
- See more at:
http://www.bd-pratidin.com/lead-news/2015/04/22/76411#sthash.52VrllNG.dpuf
Tag :
জাতীয়




0 Komentar untuk "ফিল্মিস্টাইলে ব্যাংক ডাকাতি"