ইতিহাস-ঐতিহ্য
'দুর্গাসাগর'- সাগর নয় দীঘি
পুলক চ্যাটার্জি,
বরিশাল ব্যুরো
![]() |
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রামে ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর সমকাল
|
বরিশাল নগরী থেকে প্রায়
১০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রাম। মাধবপাশা ছিল
চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের সর্বশেষ রাজধানী। ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের তৎকালীন রাজা
শিবনারায়ণ তার স্ত্রী দুর্গা রানীর নামে খনন করেন এক বিশাল জলাধার। নাম দেওয়া হয়
'দুর্গাসাগর'। রাজধানী মাধবপাশায় রাজাদের তেমন কোনো স্মৃতিঘেরা স্থাপনা না থাকলেও
দুর্গাসাগর দীঘিটি এখনও চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য এবং রাজাদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।
স্বাধীনতার পর দীঘিটি পুনঃখনন করা হয়। ১৯৯৬ সালে এই দীঘিকে 'দুর্গাসাগর দীঘি
উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য' প্রকল্পের আওতায় নিয়ে পরিণত করা হয়েছে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে।
এ দীঘির এখন তত্ত্বাবধান করছে বরিশাল জেলা প্রশাসন।
১৯৯৬ সালে উন্নয়ন ও
সৌন্দর্যবর্ধনের পর নবরূপ পায় ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দীঘি। চারপাশে বিপুল সবুজ
বৃক্ষের সমাহারে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাখিকুলের কলকাকলীতে সারা বছর
মুখর থাকে দুর্গাসাগর দীঘি। তাই সারা বছর ধরেই এ দীঘিতে আসেন পর্যটক। বিশেষ করে
শীত মৌসুমে বনভোজন এবং দর্শনার্থীদের ঢল নামে দুর্গাসাগর দীঘির চারপাশে। গত কয়েক
বছরে দর্শনার্থী আয় বেড়েছে পাঁচ গুণ। দুই-তিন বছর আগেও মাসে যেখানে দুর্গাসাগর
দীঘি থেকে দর্শনার্থী-আয় ছিল ২৫/৩০ হাজার টাকা, এখন তা এক লাখে উন্নীত হয়েছে।
দুর্গাসাগর দীঘির রয়েছে
দীর্ঘ ইতিহাস। দীঘি উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য প্রকল্পের তথ্যসূত্র এবং বিভিন্ন
ইতিহাসগ্রন্থ থেকে জানা যায়, জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রামে এই দীঘির
রয়েছে কয়েকশ' বছরের ইতিহাস। চতুর্দশ শতকে রাজা দনুজমর্দন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য
প্রতিষ্ঠা করেন। এ বংশের পঞ্চম রাজা জয়দেব। তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একমাত্র
কন্যা রাজকুমারী কমলা দেবী। কমলা দেবীকে বিয়ে করেন বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার
দেহেরগতি গ্রামের উষাপতীর পুত্র বলভদ্র বসু। রাজা জয়দেবের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায়
জামাতা বলভদ্র বসু 'চন্দ্রদ্বীপ' নামে এ রাজ্য লাভ করেন। তখন চন্দ্রদ্বীপের
রাজধানী ছিল বাকলা (বর্তমানে পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলা)। বলভদ্র বসুর
প্রপৌত্র রাজা কন্দর্প নারায়ণ (যিনি বারভুঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন) ১৫৮৪ সালে
বর্তমান বাবুগঞ্জ উপজেলা সদরের অদূরে ক্ষুদ্রকাঠিতে রাজধানী স্থাপন করেন।
ক্ষুদ্রকাঠির সিকদারবাড়ি সংলগ্ন রাজারভিটাতেই ছিল কন্দর্প নারায়ণের নির্মিত
চন্দ্রদ্বীপের দ্বিতীয় রাজধানী। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রতিবছর রাজধানীর ব্যাপক
ক্ষতিসাধন হওয়ার কারণে এবং জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পেতে সমুদ্র উপকূলবর্তী
বাকলা (বাউফল) থেকে রাজধানী বাবুগঞ্জের ক্ষুদ্রকাঠিতে স্থানান্তর করেন রাজা
কন্দর্প নারায়ণ।
১৫৮৪ সালে বাবুগঞ্জে
রাজধানী স্থাপনের মাত্র ১৫ বছর পরই রাজা কন্দর্প নারায়ণ কেন্দ্রীয় সরকারের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তখন কেন্দ্রীয় সরকারে ছিলেন দিলি্লর মোগল সম্রাট
জাহাঙ্গীর। তিনি বিদ্রোহ দমনের জন্য চন্দ্রদ্বীপ আক্রমণ করেন এবং কন্দর্প নারায়ণের
বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে রাজা কন্দর্প নারায়ণ ও তার
বাহিনী পরাজিত হয়। প্রাণ হারান রাজা কন্দর্প নারায়ণ। তখন রাজ্যের শাসনভার চলে যায়
কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। চার বছর পর রাজা কন্দর্প নারায়ণের পুত্র রাজা রামচন্দ্র
কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সন্ধি করে পুনরায় রাজ্য লাভ করেন। রাজা রামচন্দ্র ১৬০২
সালে মাধবপাশায় রাজধানী স্থাপন করেন, যা ছিল চন্দ্রদ্বীপের তৃতীয় রাজধানী। রাজা
রামচন্দ্র যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের কন্যা বিমলা সুন্দরীকে বিয়ে করেন। এভাবে
রাজতান্ত্রিক ধারায় চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে। ১৭৫৭
খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রাজতান্ত্রিক
শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এ রাজ্যের শাসনভার নিয়ে নেয়।
ব্রিটিশ সরকারের অধীনে
চন্দ্রদ্বীপের রাজা শিবনারায়ণ ১৭৮০ সালে মাধবপাশায় ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দীঘি খনন
করেন। তার স্ত্রী দুর্গা রানীর নামানুসারে দীঘির নামকরণ করা হয় দুর্গাসাগর। দীঘি
খননে এক হাজার ৮০০ শ্রমিক একাধারে ছয় মাস কাজ করেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। তৎকালীন
দীঘি খননে ব্যয় হয়েছিল তিন লাখ টাকা।
১৭৯৯ সালে চন্দ্রদ্বীপ
রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে সৃষ্টি হয়
ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন দেশের। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্গত
বর্তমান বরিশাল বিভাগের প্রাচীন নাম ছিল চন্দ্রদ্বীপ। চন্দ্রদ্বীপের সর্বশেষ
রাজধানী মাধবপাশার উপকণ্ঠে ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দীঘির অবস্থান। প্রথম খননের ১৯৪
বছর পর ১৯৭৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দীঘিটি
পুনঃখনন করেন তৎকালীন মন্ত্রী শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত। তখন দীঘির মাঝখানে একটি
দ্বীপ তৈরি করা হয়। একই বছর ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে দীঘি ও চার পাড়ের জমি সরকার
অধিগ্রহণের আওতায় নেয়। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ বরিশাল জেলা
আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপির উদ্যোগে দুর্গাসাগর
দীঘিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'দুর্গাসাগর দীঘি
উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য' প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। তখন দুর্গাসাগর দীঘির চারপাশে
নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণ ও অভ্যন্তরে সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন
করা হয় জেলা প্রশাসনের অধীনে।
জেলা প্রশাসক মো.
শহীদুল আলম জানান, দুর্গাসাগর দীঘির সৌন্দর্য রক্ষা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা
বজায় রাখতে বিশেষ কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এসব উন্নয়ন
প্রকল্পের মধ্যে থাকবে রেস্টহাউস নির্মাণ, দীঘির চারপাশে দর্শনার্থীর বসার
সুব্যবস্থা প্রভৃতি।
দীঘিটির মোট আয়তন ৪৫
দশমিক ৫৫ একর। চারপাশে চারটি ৫০ ফুটবিশিষ্ট পাকা ঘাট, মাঝবরাবর একটি দ্বীপ
দীঘিটিকে পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। লম্বায় এক হাজার ৯৫০ ফুট ও
প্রস্থে এক হাজার ৭৫০ ফুট দীঘিটির চারপাশে বিশেষ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার
প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।
Tag :
ইতিহাস-ঐতিহ্য



0 Komentar untuk "'দুর্গাসাগর'- সাগর নয় দীঘি"