সাত শহীদের রক্তে ভেজা খাপড়া ওয়ার্ড
কামাল লোহানী
আজ থেকে ৬৫ বছর আগে এক
নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বীভৎস ঘটনা ঘটেছিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া
ওয়ার্ডে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। পাকিস্তানি দুঃশাসনের কাল। কী নৃশংস হত্যাকাণ্ডই
না ঘটেছিল সেদিন, প্রাণ দিলেন সাতজন শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও জননেতা। কারান্তরালের
বন্দি কয়েদিদের ওপর যে নির্মম নিষ্পেষণ চালানো হতো, তারা এর প্রতিবাদে সংঘবদ্ধ
হয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন মানুষের উপযোগী ব্যবহার ও খাবার। সাজাপ্রাপ্তদের ওপর
যে অমানবিক শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হতো, তা প্রত্যাহারের দাবি ছিল তাদের।
মনে রাখতে হবে, সেই
সময়টা ছিল 'পাকিস্তান' কায়েমের তৃতীয় বছর আর এর আগেই শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ বিতাড়নের
শেষ দিকে তেভাগা আন্দোলন। কৃষক শ্রেণীর ওপর জোতদার-জমিদারদের অত্যাচার ও ন্যায্য
প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে তাদের নানাভাবে নিগৃহীত করার বিরুদ্ধে এবং গোলার ধান
রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ শপথে বলীয়ান কৃষক সমাজ। অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে
ওঠে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মজবুত ভিত। এই ঐক্য শাসক মুসলিম লীগ সহ্য করতে প্রস্তুত ছিল
না। তাই তারা পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পাকিস্তানেরই নাগরিক এই ঐক্যবদ্ধ মানুষগুলোর
ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দমন-পীড়নে বাংলার মানুষ সেদিন রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন
বলেই অঞ্চল ভিত্তিতে অধিকার আদায়ের লড়াই হাজং বিদ্রোহ, নাচোল বিদ্রোহ, নানকার
বিদ্রোহ, এমনি নামে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। অধিকার আদায়ের এই লড়াই সংঘবদ্ধ
হওয়ার আগেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফড়িয়া দলকে লেলিয়ে দিয়ে হত্যা আর খুন-খারাবির মধ্য
দিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করতে তারা নিপীড়ন চালিয়েছিল। তারই লোমহর্ষক বর্ণনা আমরাও
জেনেছি পরবর্র্তী সময়ে ইতিহাস থেকে। জেনেছি মহীয়সী নারী সংগ্রামী ইলা মিত্রের
নির্যাতনের কাহিনী। শুনেছি, সিলেট কারাগারে অপর্ণা পাল রায় চৌধুরী আর সুজাতা
দাসগুপ্তার জেল অভ্যন্তরে লড়াইয়ের বিবরণ সহ-রাজবন্দিদের কাছ থেকে।
রাজশাহী কেন্দ্রীয়
কারাগারে ছিলেন অগুনতি কৃষক নেতা ও কর্মী সংগঠক। তারা বেশিরভাগই ছিলেন রংপুর,
দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী ও বগুড়ার। তাদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছভাবে মামলা দিয়ে
কারাগারে পাঠিয়েছিল সাজাভোগ করার জন্য। অথচ তাদের মধ্যে বয়সী ও জখমি কৃষকবন্দিও
ছিলেন। তাদের দিয়ে যেভাবে বেহিসাবী পরিমাণে 'গম পেষা' আর 'তেল মাড়াই'য়ের কাজ করানো
হতো, তা ছিল অমানবিক। ঘানি টানার জন্য বলদ ব্যবহার করা হতো সেকালে। সেই তেল মাড়াই
ঘানিতে এসব রাজনৈতিক কর্মী-নেতাকে কলুর বলদের মতো লাগানো হতো। দৈহিক দুর্বলতার
জন্য অক্ষম ছিলেন যারা, তাদের ওপর জুলুম চলত অকথ্য। আবার খাবারের পরিমাণ ছিল
সামান্য, যা গ্রহণযোগ্য ছিল না। রাজবন্দিদের মামলা দিয়ে কয়েদির মতো রাখা হতো। তারা
সবাই মিলে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
১৯৪৯ সাল। রাজশাহী
কেন্দ্রীয় কারাগারের রাজবন্দিরা মানুষের মতো জীবনযাপনের দাবিতে অনশন করার
সিদ্ধান্ত নিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ প্রহসনের বিচার করে রাজবন্দিদের এক বছর সশ্রম
কারাদণ্ড দেয়। তাদেরকেও সাধারণ কয়েদিদের মতো শাস্তি বিধান করা হলে রাজবন্দিরা তা
বুঝতে পারলেন। কয়েদি হলেও তারা তো মানুষ; কিন্তু তাদের ওপর কী অমানবিক নির্যাতন
চালানো হতো! তাই তারা পশুর কাজ মানুষ দ্বারা করানো যাবে না বলে রুখে দাঁড়ালেন।
সাধারণ কয়েদিরা ভয়ে এতদিন যে নিপীড়ন নীরবে সহ্য করে এসেছেন, সেই গম পেষার কাজ
কিংবা ঘানি টেনে তেল মাড়াই করা_ এসব বন্ধ করার দাবি উঠালেন। স্মারকলিপি তৈরি করে
যথাযোগ্যভাবে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে তা পাঠানো হলো। কয়েদিদের আবার দাবি কিসের_ এমন
ক্ষমতা দাপটে অগ্রাহ্য করল কারা কর্তৃপক্ষ। কারা কর্তৃপক্ষের মনোভাবে নানা চেষ্টা
ব্যর্থ হলো। অবশেষে সবাই অনশন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। সহস্রাধিক সাধারণ কয়েদির
সঙ্গে রাজবন্দিরাও অনশন করলেন। কারা কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারেনি, জেলের ভেতরে হাজারেরও
বেশি মানুষ সংগঠিত হয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেবে এবং সবাই তা পালন করবে।
জেলখানার ভেতর এমন
দুঃসাহসী ঘটনা ঘটছে_ এ খবর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় এসে পেঁৗছল। ফলে কারা
কর্তৃপক্ষ প্রধান আমীর হোসেন রাজশাহী সফরের সিদ্ধান্ত নিলেন। গেলেন এবং অনশনি
কয়েদি ও রাজবন্দিদের সঙ্গে কথা বললেন, বোঝাতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু ব্যর্থ হলেন।
এবারে অনশনি বন্দিদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করলেন। রাজবন্দি ক'জনকে
সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করলেন; কিন্তু রাজবন্দি যারা ছিলেন তারা
ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা প্রতিরোধ করলেন। তারা খাপড়া ওয়ার্ড ছেড়ে যাবেন না। রাজবন্দিদের
প্রতিনিধিদের ডাকলেন আইজি আমীর হোসেন। দু'একটি দাবি মেনে নেওয়ার ভান করলেন এবং
প্রতিশ্রুতিও দিলেন। তাতে কয়েদিরা একটু আশ্বস্ত হলে তদের জেল মাঠে একত্র করা হলো।
আইজি বক্তৃতা করে বোঝালেন, 'কমিউনিস্টরা বাইরে কিছু করতে পারছে না, তাই জেলে
আপনাদের উসকে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। আপনারা কমিউনিস্টদের খপ্পরে পা দেবেন
না।' এদিকে লকআপে নিয়ে কমিউনিস্টদের বললেন, 'জেলের ভেতর বিপ্লব করছেন, এর পরিণতি
ভালো হবে না।'
আমীর হোসেন শলাপরামর্শ শেষে ঢাকা ফিরে গেলেন। এলো সেই ভয়াবহ বীভৎস নারকীয় ঘটনার দিন_২৪ এপ্রিল। জেল সুপার মি. বিল, জেলার মান্নান, দু'জন ডেপুটি জেলার, জেল পুলিশের প্রধান, জেল পুলিশ কয়েদি সর্দার বাহিনী নিয়ে সকালে খাপড়া ওয়ার্ডে এলেন। রাজবন্দি প্রতিনিধির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছিল প্রতিসপ্তাহের মতো। রাজবন্দিরা দাবি তুললেন, এমন অখাদ্য খাবার সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু জেল সুপার মি. বিল এবার রাজবন্দিদের গালমন্দ করতে শুরু করলেন। বাদানুবাদের এক পর্যায়ে সুপার একজন রাজবন্দিকে মারতে উদ্যত হন। তখন তারা জেল সুপারকে তার হাতের ছড়িসহ জেল ওয়ার্ডের ভেতর টেনে ঢুকিয়ে ফেলেন। এ অবস্থা দেখে জেলার মান্নান বাঁশি বাজান। ওয়ার্ডের ভেতর রাজবন্দি আর পুলিশের ধস্তাধস্তি। এই সুযোগে বিল পালিয়ে গেলেন। কিন্তু দু'জন ডেপুটি জেলার আটকা পড়ে গেলেন। কর্তৃপক্ষ এ জন্য 'পাগলা ঘণ্টি' বাজিয়ে দিল, যা বিপদ সংকেতে বাজানো হয়।
আমীর হোসেন শলাপরামর্শ শেষে ঢাকা ফিরে গেলেন। এলো সেই ভয়াবহ বীভৎস নারকীয় ঘটনার দিন_২৪ এপ্রিল। জেল সুপার মি. বিল, জেলার মান্নান, দু'জন ডেপুটি জেলার, জেল পুলিশের প্রধান, জেল পুলিশ কয়েদি সর্দার বাহিনী নিয়ে সকালে খাপড়া ওয়ার্ডে এলেন। রাজবন্দি প্রতিনিধির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছিল প্রতিসপ্তাহের মতো। রাজবন্দিরা দাবি তুললেন, এমন অখাদ্য খাবার সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু জেল সুপার মি. বিল এবার রাজবন্দিদের গালমন্দ করতে শুরু করলেন। বাদানুবাদের এক পর্যায়ে সুপার একজন রাজবন্দিকে মারতে উদ্যত হন। তখন তারা জেল সুপারকে তার হাতের ছড়িসহ জেল ওয়ার্ডের ভেতর টেনে ঢুকিয়ে ফেলেন। এ অবস্থা দেখে জেলার মান্নান বাঁশি বাজান। ওয়ার্ডের ভেতর রাজবন্দি আর পুলিশের ধস্তাধস্তি। এই সুযোগে বিল পালিয়ে গেলেন। কিন্তু দু'জন ডেপুটি জেলার আটকা পড়ে গেলেন। কর্তৃপক্ষ এ জন্য 'পাগলা ঘণ্টি' বাজিয়ে দিল, যা বিপদ সংকেতে বাজানো হয়।
এলেন জেল পুলিশ। পজিশন
নিলেন খাপড়া ওয়ার্ডে। খাপড়া ওয়ার্ডের গোলাকৃতি ঘরটার চারদিকে ২০টিরও বেশি জানালা।
প্রত্যেকটি জানালায় তিন-চারটি করে রাইফেল তাক করা হয়েছে ঘরে বন্দি সমস্ত মানুষের
দিকে। এরপরই শুরু হলো বেধড়ক গুলি চালানো। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পুলিশ বেপরোয়া গুলি
চালাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে রাজবন্দিরা প্রতিরোধ গড়ে তুললেন নিজেদের ব্যবহারের থালাবাসন,
ছোবড়ার গদি ইত্যাদি নিয়ে। মুহূর্তেই খাপড়া ওয়ার্ড রক্তে প্লাবিত হয়ে গেল। নিস্তব্ধ
চারদিক। এমন সময় মাথা তুললেন খুলনার তরুণ ছাত্রনেতা আনোয়ার। অমনি গুলি এসে তার
মাথায় খুলি উড়িয়ে নিয়ে গেল। নিহত হলেন তিনি। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে ওয়ার্ডেই শহীদ
হলেন সুখেন, দেলোয়ার ও সুধীন।
কী নিষ্ঠুর নির্মমতা!
গুলিতে আহত-নিহত হয়ে পড়ে আছেন ওয়ার্ডে। এর মধ্যেই একদল পুলিশ ঢুকে পড়ল লাঠি হাতে।
লাঠিচার্জ করতে লাগল বেধড়ক। ক্রমেই শহীদ হলেন শ্রমিক নেতা হানিফ শেখ, কৃষক নেতা
কম্পরাম সিং এবং জননেতা বিজন সেন। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে
শাহাদত বরণ করলেন সাত বীর। কত যে পঙ্গু-বিকলাঙ্গ হলেন। আজ তাদের কেউ বেঁচে নেই।
সেদিন ওই নির্মম-নৃশংস
জেলহত্যা দেখে শহর পুলিশ প্রধান তার বাহিনী নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিলেন; কিন্তু নারকীয়
হত্যাযজ্ঞ দেখে স্তব্ধ হয়ে তার লোকজন নিয়ে ফিরে যান এবং ওই বীভৎসতার জন্য জেল
পুলিশের নিন্দা করেন।
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিলের
মতো নারকীয় ও বড় ঘটনা কখনও ঘটেনি। সেদিন বর্বর জেল সুপার বিল ও জেলার মান্নান
শহীদদের লাশও গায়েব করে ফেলেছিলেন। আত্মীয়-পরিজনকে পর্যন্ত জানাননি। শেষ করি,
সেদিনের নারকীয়তায় ক্রমশ মৃত্যুর পথে ঢলে পড়া কমরেড বাবর আলীর কথা দিয়ে। তারা যে
গান গাইতেন তারই একটি লাইন আমায় বলেছিলেন_ 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ
জেগেছে সেই জনতা।' অভিজ্ঞ লড়াকু কৃষক নেতার কথাই সত্য হয়েছে। আমরা ওদের বিচার
করেছি এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে। জয়তু বাবর আলী। রক্তিম অভিবাদন ওই সাত শহীদকে।
তোমরা অমর সব সংগ্রামে।
# সাংস্কৃতিক
ব্যক্তিত্ব
Tag :
ইতিহাস-ঐতিহ্য



0 Komentar untuk "সাত শহীদের রক্তে ভেজা খাপড়া ওয়ার্ড"