বাংলার মুক্তকন্ঠ; মুক্তচিন্তা হোক মঙ্গলের, সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত।

লক্ষ্য নারীকে ঘরবন্দী করা - প্রসঙ্গ- বর্ষবরণের শুভদিনে অশুভ ঘটনা

লক্ষ্য নারীকে ঘরবন্দী করা
রোবায়েত ফেরদৌস


বাংলা বর্ষবরণের শুভদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে অশুভ ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ন্যক্কারজনক! যারপরনাই অমানবিক ও পাশবিক!! ঘোরতর জঘন্য ও ধিক্কারজনক!!! আপাত মনে হতে পারে ঘটনাটি নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন- যেখানে ভিড়ের মধ্যে একদল পুরুষ-পশু নারীর ওপর হামলে পড়েছে, তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে বিবস্ত্র করছে, নারীর শরীরের নানা জায়গা হাতড়ে অসুস্থ ও বিকৃত যৌনসুখ লাভের চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি এ ঘটনাকে নিছক যৌন নির্যাতন হিসেবে দেখতে নারাজ। প্রক্টর ও পুলিশের গাফিলতি, সীমাহীন দায়িত্বে অবহেলা আর নিষ্ক্রিয়তার নিন্দা জানিয়েও বলব, এর পেছনে আরও বড় রাজনীতি আছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর অগ্রসর পাঠকের সামনে সে ব্যাখ্যা হাজির করার কোশেশ করছি। প্রমাণ হিসেবে সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা সেদিনের ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পেশ করছি। 'নারীদের লাঞ্ছিত করার ছবি সিসি ক্যামেরায়' এই শিরোনামের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পুলিশের বসানো ৫ নম্বর সিসি ক্যামেরায় সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিট থেকে ৭টা ২২ মিনিট পর্যন্ত ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে একদল তরুণ বারবার মেয়েদের ঘিরে ধরছে; ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করছে। এরকম অন্তত ১০টি দৃশ্য ওই ক্যামেরায় ধারণ করা আছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্তত চারজনকে শনাক্ত করা গেছে, যারা ওই জায়গার মধ্যেই ঘুরছে-ফিরছে, ঠেলাঠেলি করে জটলা তৈরি করছে, মেয়েদের ঘিরে ধরছে। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখে চাপদাড়ি আছে। এদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি নারী ও শিশুরাও। ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফুটেজ দেখে বলেন, 'তার মনে হয়েছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে'। ফুটেজে দেখা যায়, 'ওই তরুণরা মেয়েদের ঘিরে ধরছিল। ভিড়ের কারণে যে এ রকমটা হয়নি, তা ফুটেজে স্পষ্ট। (প্রথম আলো, ১৮ এপ্রিল, প্রথম পৃষ্ঠা)।
প্রিয় পাঠক, খেয়াল করুন, ভিড়ের কারণে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে, যে রকমটা সাধারণত হয়, কিছু পুরুষ মেয়েদের গায়ে-পিঠে হাত দিয়ে বিকৃত যৌন তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করে, এবার কিন্তু ঠিক তা হয়নি। বরং মেয়েদের চারপাশে কৃত্রিম ভিড় তৈরি করে কয়েকজন তরুণ, যাদের মুখে চাপদাড়িতে ভরা, তারা এবং তাদের নেতৃত্বে এটি করা ও করানো হয়েছে। অর্থাৎ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কারা ঘটিয়েছে? আমি বলব তারা ঘটিয়েছে, যারা প্রতিবছরের মতো এবারও সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ফেসবুক, ব্লগ, টুইটারে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে বেদায়াত, ধর্মীয় চেতনার পরিপন্থী বলে প্রচার করেছে। এসব ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী আগে থেকেই বলে আসছে, নারীরা যেন এসব অনুষ্ঠানে অংশ না নেয়। পয়লা বৈশাখের মতো সর্বজনীন অনুষ্ঠান- যেখানে সব ধর্মের সব জাতির সব লিঙ্গের মানুষরা অংশ নেয়- তাকে তারা 'বে-পর্দা' আর 'অশ্লীল' বলে চিহ্নিত করে। বর্ষবরণের অনুষ্ঠান- দেশাত্দবোধক গান, কবিতা পাঠ, নাচ, ছবি অাঁকা, মেলা, রবীন্দ্র সংগীত, নারী-পুরুষের সমবেত র্যালি- তাদের কাছে নিছক 'বেলাল্লাপনা'। অথচ দূর-দূরান্ত থেকে প্রতি বছর সবাই ছুটে আসেন বর্ষবরণের মেলায় নিজেকে শামিল করতে, এই আতম্ভর আশায় যে, তারা যেন এই মিলনমেলা থেকে বাদ না যান; প্রত্যেকেই যে এই সংস্কৃতির একজন গর্বিত উত্তরাধিকার বৈশাখের মেলায় এসে তার জানান দিতে চান। বাংলাদেশে বহুজাতি, বহুভাষা আর বহুধর্মের মানুষ বাস করে- সমাজের এ বহুত্ববাদী বিন্যাস আমাদের শক্তি; নিঃসন্দেহে ভাটিয়ালি, কবিয়াল, গম্ভীরা, জারি-সারি-লোককাহিনী আমাদের সংস্কৃতির সবল দিক; পট, পুতুল নাচ, ঘুমপাড়ানি গান, ছড়া সেও শক্তিশালী দিক বৈকি। বাংলাদেশের দেশাত্দবোধক গান আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের বিস্ময়কর সম্পদ- দেশকে নিয়ে এত সুরেলা, এত আবেগমেশানো গান পুরো পৃথিবীতেই বিরল। সংগীতের কোনো সীমান্ত নেই- নিয়ত এর প্রমাণ বাংলা সংগীত রেখে চলেছে। রবীন্দ্র-নজরুল-লালন-বাউল আমাদের চেতনায় সদা জাগরুক; কিন্তু মৌলবাদী শক্তি হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এই যে ধর্মনিরপেক্ষ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাকে ধ্বংস করতে চায়; আমাদের সংস্কৃতি আমাদের সবল দিক, পয়লা বৈশাখ, রমনার বটমূল, গান-কবিতা আমাদের রাষ্ট্রের উজ্জ্বল দিক; রমনা আর বোশেখ উৎসবের ভিতরে যে অসাম্প্রদায়িক আর ধর্মনিরপেক্ষ উপাদান সেটা আমাদের শক্তি; বিপরীতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পকেটে যে ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা, আর উগ্রবাদ বিরাজ করছে ও বিস্তৃত হচ্ছে তা আমাদের ক্ষয় ও ক্ষতির দিক। সাম্প্রদায়িক বিভাজন, মৌলবাদ, কুসংস্কার, জঙ্গিত্ব, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মের নামে রক্তক্ষয়- আমাদের অতিশয় দুর্বল দিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পয়লা বৈশাখের বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হয়েছে তার সারমর্ম তুলে ধরছি : 'প্রকৃতপক্ষে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হচ্ছে মজুসি, মুশরিক, হিন্দু ও বৌদ্ধদের। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হচ্ছে মজুসিদের নওরোজ পালনের অনুষ্ঠান। সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু মুশরিকদের ঘটপূজা, বৌদ্ধদের উল্কি অঙ্কন। ফলে তারা নওরোজ বা নববর্ষ পালন উপলক্ষে পান্তা খায়, গানবাজনা করে, র্যালি করে, জীব-জানোয়ারের মুখোশ পরে, মিছিল করে, শরীরের নানা অঙ্গ-প্রতঙ্গে উল্কি অাঁকে, ডুগডুগি বাজিয়ে নেচে নেচে হৈহুল্লোড় করে, পুরুষরা ধুতি ও কোণাকাটা পাঞ্জাবি পরে যা হিন্দুদের জাতীয় পোশাক, মেয়েরা লাল পেড়ে সাদা শাড়িসহ হাতে রাখি বাঁধে, শাঁখা পরে, কপালে লাল টিপ ও চন্দন এবং সিঁথিতে সিঁদুর দেয়, বেপর্দা, বেহায়া হয়- যা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত। বিজাতীয় অশ্লীল, নোংরা, পাপ সংস্কৃতি পয়লা বৈশাখ দ্বীন-বিরোধী। যারা পয়লা বৈশাখ পালন করবে তারা কুফরি করবে। অতএব মুসলমানদের উচিত বিপদগামী হয়ে সংবাদপত্র, অনলাইন মিডিয়ায় এসব প্রকাশ না করা ইত্যাদি।' কাজেই আমার প্রতীতি, এবারের বর্ষবরণে পরিকল্পিতভাবে মৌলবাদী শক্তি অন্যদের সাহায্য নিয়ে বা ব্যবহার করে নারীদের যে অবমাননা করেছে তার উদ্দেশ্য কেবল যৌন নিপীড়ন নয়, এর মধ্য দিয়ে এই অন্ধ পশ্চাৎপদ শক্তি নারীদের এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, 'নারী তুমি ঘরে থাক। আবার ফিরে চলো গৃহে। বন্দী থাক। অবরোধবাসিনী তুমি, কেন তবে ঘর থেকে বাইরে বেরোও। কেন গার্মেন্টে কাজ কর? কেন দৃপ্ত পা ফেলো অফিস প্রেমিসে? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ও পড়াতে আস? বিমান চালাও? এভারেস্টের শৃঙ্গ জয় কর?' এরাই রমনার বটমূলে বর্ষবরণের ভোরে, একুশের প্রভাতফেরিতে আর উদীচীর অনুষ্ঠানে হামলা চালায়, মানুষ হত্যা করে। হুমায়ুন আজাদ কিংবা অভিজিতের হত্যার সঙ্গেও এই অপশক্তি কীভাবে জড়িত তা আমরা দেখেছি, জেনেছি। শাহবাগ আমাদের শক্তি জোগায় আবার শাপলা চত্বর আমাদের ভীত করে; শাহবাগের গণজাগরণকে যদি বলি 'থিসিস', শাপলার হেফাজতের সমাবেশকে তবে বলতে হয় 'অ্যান্টি-থিসিস'; সত্য যে সমাজে পরস্পরবিরোধী এ দুটি শক্তি কিন্তু আছে, আছে তাদের দ্বান্দ্বিকতাও- যার যার শক্তি তারা প্রদর্শন করছে এবং করবেও। এ দুয়ের 'সিনি-থিসিস' কীভাবে হয় সেটাই এখন 'দেখিবার অপেক্ষা'।
আমি তাই বলব, পয়লা বৈশাখে যারাই এ ঘটনা ঘটাক তাদের উদ্দেশ্য একটাই: নারীর পুনঃবন্দিত্ববরণ। এই একুশ শতকেও নারীকে বৃত্তাবদ্ধ করে রাখার পুরাতন পুরুষালি কৌশলই ওই দিন আবার নতুন করে ব্যবহার করা হয়েছে নারীর ওপর। তারা তাদের কৌশলের প্রয়োগ ঘটিয়েছে শিশু নারী আর বয়স্ক নারীর ওপরও। এই কৌশল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয়। একাত্তরে পাকিস্তানি আর্মি আর তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর-রাজাকাররা বাঙালি আর আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ করেছিল কেবল যৌনতৃপ্তির জন্য নয়, ধর্ষণ ছিল তাদের এক যুদ্ধকৌশল। ধর্ষণের মধ্য দিয়ে তারা পুরো জাতির মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল আর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করতে চেয়েছিল। এবারের বর্ষবরণের নিপীড়নকেও আমি সেভাবে ব্যাখ্যা করব- এখানে যৌন নিপীড়ন উপলক্ষ, নিপীড়নকারীদের লক্ষ্য আরও সুদূরপ্রসারী- নারীর বন্দিত্ববরণ। আফগানিস্তান, পাকিস্তানে আমরা দেখেছি মৌলবাদী শক্তির প্রধান শিকার হচ্ছে নারী। তারা নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে; তারা নারীর স্বাধীন সত্তার বিকাশে দারুণ ভীত। হেফাজতের তেঁতুল হুজুর যে ১৩ দফা দিয়েছিলেন তারও প্রধান লক্ষ্য ছিল নারীকে আটকে ফেলা, মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। ঘরের বাইরে অফিসে-আদালতে-কারখানায় সর্বত্র নারীর যে দৃপ্ত পদচারণা মৌলবাদ তাকে ভয় পায়। এক ঢিলে তারা দুই পাখি মারতে চায়। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে মৌলবাদী শক্তি নারীকে বৃত্তাবন্দী করতে সেই পুরনো পুরুষতান্ত্রিক কৌশলই খাটিয়েছে। 'পুরুষতন্ত্র' আর 'মৌলতন্ত্র' মিলেমিশে 'পুরুমৌলতন্ত্র' প্রতিষ্ঠা করেছে; বাংলা 'পুরু' শব্দের মানে 'মোটা', 'স্তর'- ফলে নারীর প্রতিপক্ষের যে শক্তি তার পুরুত্ব অনেক স্তরযুক্ত ভীষণ শক্তিশালী।
জিততে হলে তার চেয়েও বড় শক্তি নিয়ে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হবে। আসুন, সবাইকে সে লড়াইয়ে শামিল হওয়ার ডাক দিয়ে যাই।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
robaet.ferdous@gmail.com
- See more at:

http://www.bd-pratidin.com/open-air-theater/2015/04/22/76472#sthash.2GiYaL5Z.dpuf
0 Komentar untuk "লক্ষ্য নারীকে ঘরবন্দী করা - প্রসঙ্গ- বর্ষবরণের শুভদিনে অশুভ ঘটনা"

KANGLA ONLINE

Copy Protected by Surozeet Kumar Singha.

ONLINE RADIO 1

FM Radio of Bangladesh

RADIO 3

RADIO 4

BREAKING NEWS

Back To Top