কী আনন্দ আকাশে বাতাসে
ইংল্যান্ডকে
হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ
সঞ্জয়
সাহা পিয়াল
অসম্ভব, আশ্চর্য এক শিহরণ; গ্যালারি থেকে লাল-সবুজের পতাকা চেয়ে
গগনকাঁপানো চিৎকার মাশরাফির। এটা কি গর্বের রোমাঞ্চ, আনন্দের, সার্থকতার নাকি
যুদ্ধজয়ের পর কোনো সৈনিকের বুকে জমে থাকা সব কষ্টের উদগিরণ! বোঝা যাচ্ছিল না
অ্যাডিলেড ওভালের প্রেসবক্সে বসে। তবে এটুকু তো পরিষ্কার হয়ে যায় তখন, ২০১৫
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ। যা ছিল শুধুই মায়াবী স্বপ্নের ঘোর, সেটাই
তখন সূর্যের আলোর মতো সত্য ও সুন্দর।
তামিমের ক্যাচ মিস, তাসকিনের ফুলটস- সব মিথ্যা হয়ে তখন একটাই
ধ্বনি- 'বাংলাদেশ... বাংলাদেশ...'। তাসমান পেরিয়ে তা নিশ্চয়ই ছুঁয়েছিল
বঙ্গোপসাগরে। ইংল্যান্ডকে ১৫ রানে হারিয়ে টাইগাররা যে ইতিহাস লিখেছে অ্যাডিলেডে,
তা অ্যাডিলেড ওভালের ব্র্যাডম্যান মিউজিয়ামে হয়তো জায়গা পাবে না, তবে
ব্র্যাডম্যানের মতো ইংলিশ-বধের কাহিনীতে লেখা থাকবে এই সন্ধ্যাটি। অনেক অনেক দিন
পরও অ্যাডিলেড বলবে, এখানেই ৮ রানে ২ উইকেট।
পড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ; রুবেল নামের এক পেসার নিয়েছিলেন চার-চারটি উইকেট। 'বাংলাদেশ
ক্রিকেটে অনেক বড় জয় রয়েছে, তবে বিশ্বকাপের মতো আসর, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে
ইংল্যান্ড- সব মিলিয়ে আমার দেখা সবচেয়ে বড় জয় এটিই।' ম্যাচ শেষে মনের কথাটি খুলে
বলছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
টাইগারদের এই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের
আকাশে-বাতাসে। গতকাল দেশজুড়ে ছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
অধিনায়ক মাশরাফির সামনে তখন কোনো ব্রিটিশ সাংবাদিক ছিলেন না।
অসৌজন্যতার চরম উদাহরণ দিয়ে তারা মরগানের পর মাশরাফির সংবাদ সম্মেলন থেকে বেরিয়ে
গিয়েছিলেন। 'ওরা থাকলে ভালো হতো। বলে দিতাম- দেখ, আমরাও পারি। আমাদের নিয়ে আর কিছু
লেখার সাহস করো না', মাইকের সামনে নয়, বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে বুক মিলিয়ে
মনের কথা খুলে বলছিলেন মাশরাফি। হিসাব করছিলেন কোয়ার্টারের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ
নিয়ে।
যদি ধরেই নেওয়া হয়, এই গ্রুপ থেকে বাংলাদেশ হচ্ছে চতুর্থ আর ভারত
প্রথম, তাহলে শেষ আটে দেখা হবে দুই প্রতিবেশীর। কিন্তু পরের ম্যাচটি বাংলাদেশ যদি
নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দেয়, তাহলে প্রতিপক্ষ হতে পারে পাকিস্তান কিংবা দক্ষিণ
আফ্রিকা। সম্ভাবনার আঁচ পেয়েই কি-না কে জানে, এদিন মাশরাফিদের খেলা দেখতে মাঠে
এসেছিলেন আফ্রিদিরা। দেখে গেছেন বদলে যাওয়া একটি 'বাংলাদেশ'কে। এদিন টস হেরে যখন
ব্যাটিং পেয়েছিলেন মাশরাফিরা, তার একটু আগেই বৃষ্টি থেমেছে। পিচের সুবিধায় শুরুতে
সুইং পেয়েছিলেন দুই ইংলিশ পেসার অ্যান্ডারসন আর ব্রড। তাতেই তামিম আর ইমরুল দুটি
করে রান নিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ তুলে দেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের কট্টর সমর্থকও তখন খারাপ কিছুর শঙ্কা করছিলেন।
কিন্তু এখানেই বদলে যাওয়া একটি দল ধরা দেয়। তিন নম্বরে নেমে সৌম্য সরকার যেভাবে
অ্যান্ডারসনকে কভার আর পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি-ছাড়া করেন, যেভাবে ছক্কা হাঁকান মইন
আলিকে- তাতেই অক্সিজেন খুঁজে পায় স্কোরবোর্ড। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও ব্রডের ফুলার
লেন্থগুলো এক্সট্রা কভার দিয়ে পত্রপাঠ বিদায় করতে থাকেন। ওভারপ্রতি ৪ দশমিক ৭৩
নিয়ে দুজনের ৮৬ রানের জুটি গড়ে ওঠে।
ওভালের ঘাসের গ্যালারিতে বিয়ারের ক্যান নিয়ে বসা ইংলিশ সমর্থকের দল
'বার্মি আর্মি'রা তখন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু তারা পাত্তা পায়নি, গ্যালারিতে
প্রায় হাজার চারেক বাংলাদেশি। সারাক্ষণ কাঁসরঘণ্টা বাজিয়ে তারা ক্রিকেটারদের নামে
স্লোগান দিতে থাকেন।
দারুণ জুটি গড়ার পর সৌম্য ৪০ রান করে আউট হয়েছিলেন জর্ডানের একটি
বাউন্সারে। তার পর সাকিব এসেও মইন আলির স্লিপের ফাঁদে পা দেন। ফিরে যান ২ রান করে!
৫ রানের মধ্যে সৌম্য আর সাকিবকে হারিয়ে সমর্থকরা দুশ্চিন্তায় পড়লেও মাহমুদুল্লাহ
রিয়াদ আর মুশফিক জুটি বেঁধেছিলেন আত্মীয়ের মতোই। দু'জনের পঞ্চম উইকেট জুটিতে আসা
১৪১ রানই ছিল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এই জয়ের অন্যতম ভিত।
একদিক থেকে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ অ্যান্ডারসনকে ফাইন লেগ দিয়ে, ওকসকে
কাউ কর্নার দিয়ে ছক্কা হাঁকাচ্ছিলেন; আরেক পাশ থেকে মুশফিকের সেই প্রিয়
'সুইপ'গুলো। অ্যাডিলেড ওভালকে ক্যানভাস বানিয়ে দুই শিল্পী যেন শুধুই তুলির আঁচড়
দিচ্ছিলেন। ডিপ মিড উইকেট দিয়ে মুশফিক ওকসকে যে ছক্কাটি হাঁকিয়েছিলেন, তা এবারের বিশ্বকাপের
কোনো বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। রিয়াদ ১৩০ বলে সেঞ্চুরি করলেও
মুশফিককে থামতে হয় ৮৯ রানে। শেষ ১০ ওভারে আসে ৭৮ রান। তবে মুশফিকের বিদায়ের পর
৪৯তম ওভারে জর্ডান যে ওয়াইড ইয়র্কারগুলো দেন, তাতে অন্তত ১০টি রান থেকে বঞ্চিত
থাকতে হয় বাংলাদেশকে।
কিন্তু চাপে পড়া ইংলিশদের পাতে বাংলাদেশের ৭ উইকেটে করা ২৭৫ রান কম
ছিল না। তার ওপর গ্যালারি সারাক্ষণ যে বাংলাদেশ... বাংলাদেশ... স্লোগান দিল, সেটা
আরও ১০টি রান যেন বাড়তি চাপিয়ে দেয় ইংলিশদের। শুরুতে ইয়ান বেল আর মইন আলি
তেড়েফুঁড়ে খেলছিলেন। কিন্তু ১৯ রানে থাকা মইন আলির রানআউট ভেঙে দেয় জুটি। মাশরাফি
প্রথম দিকে অনেকগুলো রান দিলেও তুলে নেন হলসকে। কিন্তু ইয়ান বেল তার অভিজ্ঞতার
ঝুড়ি থেকে একে একে তাসকিন, সানি, রুবেলকে বেছে নিয়েছিলেন। তবে সেই রুবেলই তার গতি
বাড়িয়ে ফিরিয়ে দেন ৬৩ রানে থাকা বেলকে। ইংলিশ অধিনায়ক মারগানও ফিরে যান রুবেলের ওই
২৭তম ওভারে। ১২১ রানে ৪ উইকেট পড়া দেখে প্রেসবক্সে থাকা ব্রিটিশ সাংবাদিকদের ভ্রু
সংকুচিত হতে থাকে। ইনিংস বিরতির সময় লন্ডনের এক টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন
রমিজ রাজা। বলছিলেন, 'ম্যাচটি ইংল্যান্ডই জিতবে, কারণ বাংলাদেশের পেস অ্যাটাক অত
ভালো নয়...।'
বেচারা রমিজ রাজাকে এর পর আর দেখা যায়নি প্রেসবক্সের আশপাশে। পেলে
জিজ্ঞাসা করতাম, রুবেলের শেষ ওভারটা কেমন দেখলেন। যে ইয়র্কারে রুবেল ব্রড আর
অ্যান্ডারসনকে বোল্ড করলেন, যে স্পেলে এনে মাশরাফি তুলে নিলেন হলস আর জো রুটকে-
সেটা কেমন দেখলেন।
শেষ দিকে তাসকিনের কিছু ফুলটস বাউন্ডারি ছাড়া করেছিলেন ওকস, নটআউট
থেকেছিলেন ৪২ রানে। এটা স্বীকার করতেই হয় যে, তার বাউন্ডারিগুলো টেনশনে ফেলে
দিয়েছিল মাশরাফিদের। ২০ বলে ৩২ থেকে সুতোয় দাঁড়িয়েছিল ১২ বলে ১৬। এর মধ্যে ওকসের
ক্যাচ মিস করে বিশ্বকাপটাই যেন ফেলে দিচ্ছিলেন তামিম। তার এই সহজ ক্যাচ মিসের
দৃশ্য কোটি কোটি মানুষকে বিহ্বল, বিস্মিত ও ক্রোধান্বিত করেছে। কিন্তু তাতে ঘাবড়ে
না গিয়ে মাশরাফি ভরসা রেখেছিলেন তার পেসারদের ওপরই। তাই ম্যাচ শেষে ব্রিটিশ
সাংবাদিকদের না পেলেও ইংরেজিতেই বলে দিয়েছেন, 'আমাদের পেসারদের একটু সম্মান দেবেন প্লিজ...।'
ব্রিটিশরা দেখুক বা না দেখুক, ১৬ কোটি বাংলাদেশির হদয়ে তো থাকবে তা।
Tag :
খেলা



0 Komentar untuk "কী আনন্দ আকাশে বাতাসে"