একদিন কমিউনিস্ট ছিলাম রে...
০৩ মার্চ, ২০১৫ ইং
আলোকপাত
বিভুরঞ্জন সরকার
আমার এই লেখাটি পড়ে সিপিবির বন্ধুরা আমার ওপর রাগ করবেন। আমাকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল, সিআইএর এজেন্ট, সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী ইত্যাদি নানা বিশেষণে ভূষিত করতেও হয়তো দ্বিধা করবেন না। তারপরও বিবেকের তাড়নায় এই লেখাটি লিখছি। আমার মতো একসময় ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন কিন্তু দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে ভাবেন, এমন অনেকের সঙ্গেই মাঝে-মধ্যে দেখা-সাক্ষাত্ হয় এবং তারা প্রায় সবাই সিপিবির বর্তমান রাজনৈতিক লাইন নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাদের অনেকেই এটা বলেন যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি থেকে সম-দূরত্বের নীতি নিয়ে সিপিবি আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু কাছাকাছি গেছে বিএনপির। বড় দু’দলের বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার নামে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে এক পাল্লায় তুলে এক ভাষায় সমালোচনা করে সিপিবি কার্যত বিএনপির সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে বলেও তারা মনে করছেন।
স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন থেকে শুরু করে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সূচনাপর্ব পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছি। ছাত্র আন্দোলনের কর্মী থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছি পার্টি ভাঙনের মুহূর্ত পর্যন্ত। সিপিবি ভাগ হওয়ার পর নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা দেখে আর পার্টি করার আগ্রহবোধ করিনি। তারপরও আমি যে একসময় কমিউনিস্ট ছিলাম, সেজন্য কখনো আফসোস বা অনুতাপ হয়নি। বরং গৌরব বোধ করেছি। কারণ ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত না হলে পৃথিবীকে দেখা-শোনার যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সেটা অর্জন করা সম্ভব হতো না। ছাত্র ইউনিয়ন এবং পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িত হওয়ার মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলাম বলেই দেশকে এবং মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা কিছুটা হলেও অর্জন করতে পেরেছি।
কমিউনিস্টরা একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন তার কোনো তুলনা হয় না। সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে কৃত্রিম পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই কমিউনিস্টরা অত্যন্ত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেও অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতির দীপশিখা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে যে বন্দীদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল তারা ছিলেন কমিউনিস্ট। কারাবন্দী ইলা মিত্র চরম পুলিশী বর্বরতার শিকার হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট। কমিউনিস্ট নেতা মনি সিংহের বাড়ি-ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল নুুরুল আমিন সরকার। সত্তরের নির্বাচনের সময় আমাদের এলাকায় আওয়ামী লীগের এক নির্বাচনী সভায় তত্কালীন আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক ইউসুফ আলী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন, জেল-জুলুম সহ্য করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমাদের নেতার জীবন থেকে ১৩টি বসন্ত নষ্ট হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৩ বছর কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন, সেটাই তিনি বুঝিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের জনসভার কয়েকদিন পর একই জায়গায় হয়েছিল ন্যাপের জনসভা। আমরা তখন ন্যাপ প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছি। জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সদ্য কারামুক্ত প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা গুরুদাস তালুকদার। ন্যাপের একজন নেতা তার বক্তৃতায় গুরুদাকে দেখিয়ে বলেন, শেখ মুজিবের জীবনের ১৩টি বসন্ত নষ্ট হয়েছে, আর আমাদের অনেক নেতার জীবনে বসন্তই আসেনি। উল্লেখ্য, গুরুদাস তালুকদার রাজনৈতিক জীবনে মোট ৩৫ বছরের বেশি জেলে এবং আত্মগোপনে কাটিয়েছেন। কমিউনিস্টদের জীবন ছিল আদর্শের, ত্যাগের। কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতে পারা তাই কারো জন্যই অগৌরবের ছিল না। কমিউনিস্টদের সংগ্রাম সাধনা ও আত্মত্যাগের গৌরবগাথা দু’চার কথায় লিখে শেষ করার নয়। কাজেই এই পার্টির সদস্য হতে পারাটা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের। সেজন্য একদিন কমিউনিস্ট ছিলাম বলে আমি গর্বিত।
প্রসঙ্গত একটি পুরনো ঘটনার কথা মনে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় পরিষদের এক সভায় সংগঠন বিলুপ্ত করে বাকশালের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (বর্তমানে সিপিবির সভাপতি), নূহ-উল-আলম লেনিন (বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য), আবদুল কাইয়ুম মুকুল (বর্তমানে প্রথম আলোর যুগ্ম-সম্পাদক, মুকুল নাম ব্যবহার করেন না), মাহবুব জামান (বর্তমানে ‘ডাটা সফট’ নামের কম্পিউটার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নানা তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছাত্র ইউনিয়নের আলাদা অস্তিত্ব না রাখার পক্ষে অর্থাত্ একক ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগ গঠনের গুরুত্ব ও তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা দেন। দেশকে প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবিপ্লবের হাত থেকে রক্ষা করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একক দল গঠনের কোনো বিকল্প নেই— এমন যুক্তিই সেদিন উপস্থাপন করা হয়েছিল। উত্তরবঙ্গের একটি জেলা থেকে আগত একজন প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্যের বিরোধিতা করে যা বলেছিলেন তার সংক্ষিপ্তসার এই রকম: ‘আপনারা আমার চেয়ে অনেক বেশি তত্ত্ব জানেন, আপনাদের হাতে তথ্য-উপাত্ত আমার চেয়ে হয়তো বেশি আছে, তাই আপনাদের মতো তত্ত্ব-তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে আমি বলতে পারবো না। তবে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ভিত্তিতে আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, এক দল গঠন করাটা ঠিক হচ্ছে না। ইস্যুভিত্তিক ঐক্য গড়ে আন্দোলন করা আর এক দল করা এক বিষয় হতে পারে না।’ বলা নিষ্প্রয়োজন যে, সেদিন ওই জেলা প্রতিনিধির কাণ্ডজ্ঞানভিত্তিক বক্তব্য তত্ত্বীয় অবস্থানের কাছে হার মেনেছিল।
এখনো কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক লাইন তত্ত্বের ওপর জোর দিয়ে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানকে উপেক্ষা করেই গ্রহণ করা হয়েছে বলে যদি কেউ মনে করেন তাহলে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের (তখনো তিনি বঙ্গবন্ধু হননি) সঙ্গে কমিউনিস্ট নেতা মনি সিংহ ও খোকা রায়ের গোপন বৈঠক পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিল। ৬-দফা, ১১-দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং তার ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধ— সবকিছুতেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টিরও অসামান্য অবদান ছিল। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশকে গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখেই অগ্রসর হয়েছে। রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু সরকারের ভালো কাজের সমর্থন, খারাপ কাজের নিন্দা করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এজন্য সিপিবিকে তখন আওয়ামী লীগের ‘বি-টিম’ বলে নিন্দা-সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। আওয়ামী লীগ-ন্যাপ-সিপিবি মিলিয়ে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট এবং এক পর্যায়ে বাকশাল গঠন— এসব ইতিহাস রাজনীতি সচেতন সবারই জানা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে নব্বইয়ের এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবির সম্পর্কে মাঝে-মধ্যে টানাপড়েন দেখা দিলেও তা কখনো শত্রুতার পর্যায়ে যায়নি। সবসময়ই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবির মিত্রতার সম্পর্কই বজায় ছিল। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে সিপিবির একক শক্তিতে দেশে প্রগতির চাকা এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না— এটাই মনে করা হচ্ছিল। তবে অবস্থা বদলে যায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের নেতা বলে পরিচিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর। ওই পতনের ধাক্কায় আমাদের দেশে বাম আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী দল কমিউনিস্ট পার্টিও ভেঙে যায়। মনজুরুল আহসান খান-মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে যারা সিপিবির লাল পতাকা বহনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকেন, তারা ‘আবিষ্কার’ করেন যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে এতদিন ঐক্যের নীতি নিয়ে চলা ভুল হয়েছিল। আর আওয়ামী লীগের বি-টিমগিরি নয়। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দেশে একটি ‘বাম বলয়’ গড়ে তোলার প্রত্যয় ঘোষণা করে তারা মাঠে নামেন। আওয়ামী লীগ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে থাকেন। নতুন এই রাজনৈতিক লাইনের পক্ষে যুক্তি, তত্ত্ব, তথ্য হাজির করা হয় যথারীতি। বামপন্থিরা এই কাজটি খুব ভালো পারেন। যেটাই লাইন হোক, তার পক্ষে যুক্তি-তত্ত্ব ও যুক্তি তৈরি করা হয়। ১৯৭৪ সালে ডাকসুর ব্যালটবাক্স ছিনতাইয়ের পরেও তত্ত্ব হাজির করা হয়েছিল, আবার জিয়াউর রহমানকে সীমিত অর্থে জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক তকমা দিয়ে ‘খাল কাটা’য় অংশ নেয়া কিংবা জিয়ার তামাশার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেয়ার সময়ও যুক্তি-তত্ত্বের অভাব হয়নি।
সিপিবি এখন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে মুদ্রার এ-পিঠ ও-পিঠ মনে করে। একদল আপদ আর একদল বিপদ— এই মুখরোচক কথা সিপিবি নেতারা দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রচার করে আসছেন। কিন্তু তাতে লাভ কি হচ্ছে? আওয়ামী লীগ নিন্দিত হলে সিপিবি কি প্রশংসিত হচ্ছে? আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবি যতদিন ‘ঐক্য এবং সংগ্রামের নীতি’ নিয়ে চলেছিল, ততদিন কি সিপিবির সাংগঠনিক শক্তি বেড়েছিল, না কমেছিল? সিপিবি যখন থেকে আওয়ামী লীগ বিরোধিতার নীতি নিয়ে চলছে তখন থেকে কি সিপিবির জনসমর্থন বেড়েছে? পার্টির সাংগঠনিক শক্তি কি বেড়েছে?
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সিপিবি অংশগ্রহণ না করায় সিপিবি-দরদী অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে যেসব যুক্তি হাজির করা হয়েছিল, তা অনেকের কাছেই হাস্যকর মনে হয়েছে। এটা কারো বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, বিএনপি অংশ না নেয়াতেই সিপিবিও মূলত নির্বাচন থেকে দূরে থেকেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়া গেলে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে সিপিবি আপত্তি করলো কেন? তত্ত্ব দিয়ে হয়তো এর একটা ব্যাখ্যা সিপিবি দেয় কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে কি তা মেনে নেয়া যায়? সিপিবি নেতারা হয়তো বলবেন যে, সিপিবি নির্বাচনে অংশ নিলে পরিস্থিতির কি এমন পরিবর্তন হতো? সিপিবি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার মতো দল নয়। কিন্তু তারপরও তারা যদি অংশ নিতো তাহলে একতরফা নির্বাচনের অপবাদ কিছুটা কম হতো। এখন যেমন বিএনপি বলতে পারছে, সিপিবির মতো পরীক্ষিত বন্ধুও আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই, সেটা বলতে পারতো না। কমিউনিস্ট তথা বাম প্রগতিশীলরা আওয়ামী লীগের পক্ষে দাঁড়ায়নি, দাঁড়িয়েছে কার্যত বিএনপির পক্ষে— যে বিএনপির রাজনীতি এখন জামায়াতের মতো যুদ্ধাপরাধীদের দল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত। এটা সিপিবির জন্য কোনোভাবেই গৌরবের নয়। সিপিবি নেতারা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান কিন্তু জামায়াতনির্ভর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে এক কাতারে ফেলে সমালোচনা করেন।
সিপিবি নেতারা বলে থাকেন যে, একদলের ক্ষমতায় থাকার এবং আরেক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার জেদাজেদি দেশকে গভীর সঙ্কটের মধ্যে ফেলেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা আর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া সিপিবির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক মনে হলেও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান তা বলে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সিপিবি নেতারা উচ্চকণ্ঠ। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পন্ন করার কাজটি বর্তমান সরকার হয়তো সবার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী অগ্রসর হতে পারছে না। কিন্তু করছে তো। এই সরকারের বদলে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে বলে সিপিবি নেতারা বিশ্বাস করেন? এবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের প্রভাব-প্রতিপত্তি কতটা বাড়বে, সেটা কি সিপিবি বুঝতে পারছে না? আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ চালাতে পারছে না, সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করলো না, যথেষ্ট প্রগতিশীল নীতি-পদক্ষেপ নিচ্ছে না— এসব সমালোচনা করা যেতেই পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের ওপর দেশি-বিদেশি প্রচণ্ড চাপের কথা কি অস্বীকার করা যাবে? কোন রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভরসা করে আওয়ামী লীগ ‘বিপ্লবী’ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে? নারী উন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধে যখন সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি মাঠে নামে তার বিরুদ্ধে সিপিবি বা অন্য প্রগতিশীল বামপন্থিদের সেভাবে মাঠে নামতে দেখা যায় না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হলে কিংবা রায় কার্যকর করলে জামায়াত-শিবির যে তাণ্ডব করে তার মোকাবেলায় যথেষ্ট শক্তি সমাবেশ কি বাম-প্রগতিশীলরা করতে পারেন?
দেশে একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সিপিবির উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার শেষ নেই। প্রশ্ন হলো, দেশে একটি ভালো নির্বাচন হলে সিপিবির কি লাভ? তারা ক্ষমতায় যাবে? সিপিবির কয়জন প্রতিনিধি সংসদে যেতে পারবেন? দেশে এখন একটি ভালো নির্বাচন জরুরি, নাকি সাম্প্রদায়িক জঙ্গি শক্তির উত্থান রোধ বেশি জরুরি? আমেরিকা কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে চোখে আমাদের দেশের রাজনীতির সংকটকে দেখে থাকে, সিপিবিও কি সেই চোখেই দেখবে? বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে ইউরোপ-আমেরিকার হয়তো ক্ষতি নেই। কিন্তু সিপিবি কি মনে করে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ দেশে তৈরি করে দেবে? যদি তা না হয় তাহলে সিপিবি কেন আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা সহ্য করতে পারছে না?
একসময় কমিউনিস্ট ছিলাম, এজন্য যেমন গৌরব বোধ করি, তেমনি এখন যে আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নেই, সেজন্য কোনো লজ্জা বা গ্লানি অনুভব করি না। কমিউনিস্ট হিসেবে গৌরব বা অহংকার বোধ করি এই পার্টির অতীত সংগ্রামী ঐতিহ্যের কারণে। আবার এখন কমিউনিস্ট নই, এটাও আমাকে গর্বিত করছে এজন্য যে, ভুল রাজনীতি অনুসরণ করে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বৃদ্ধিতে কোনোভাবেই সহায়তা করছি না।
n লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
bibhu54@yahoo.com
Tag :
রাজনীতি


0 Komentar untuk "একদিন কমিউনিস্ট ছিলাম রে..."