কামারুজ্জামানের রিভিউ
আবেদন খারিজ
মৃত্যুদণ্ড বহাল
আহমেদ আল আমীন
যুদ্ধাপরাধী জামায়াত
নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ
করেছেন সুপ্রিমকোর্ট। আপিল বিভাগের চার সদস্যের একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চের পক্ষে
গতকাল সকালে এ রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এর ফলে
একাত্তরের হত্যা ও ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর এই
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দণ্ড কার্যকরে আর কোনো বাধা নেই। ১৯৭১ সালে
মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুরে ১২০ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে
হত্যার দায়ে ময়মনসিংহের আলবদর নেতা কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড
কার্যকর করার আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা
কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পরিবারের সদস্যরা। এখন এই
মানবতাবিরোধী অপরাধীর দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা ছাড়া
আর কোনো বাধা রইল না। সকালে রায়ের পর মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন,
কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরোয়ানা আগেই জারি হওয়ায় দণ্ড কার্যকরে নতুন করে আর কোনো
আনুষ্ঠানিক আদেশের প্রয়োজন হবে না। নিয়ম অনুযায়ী কামারুজ্জামান অপরাধ স্বীকার করে
প্রাণভিক্ষা চাইলে রাষ্ট্রপতি সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অথবা কামারুজ্জামান
প্রাণভিক্ষার আবেদন না করলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকরের
ব্যবস্থা নেবে। কারা কর্তৃপক্ষ দণ্ড কার্যকরের সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে জানা
গেছে। এটি হবে মানবতাবিরোধী অপরাধে দ্বিতীয় কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা। এর
আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধী ও জামায়াতে ইসলামীর আরেক সহকারী
সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।রায় ঘোষণার
আগে সকাল ৯টার পরপর আপিল বিভাগের এজলাসে আসন গ্রহণ করেন বেঞ্চের চার সদস্য। একে
একে এজলাসে আসন গ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো.
আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি এ এইচ এম
শামসুদ্দিন চৌধুরী। ৯টা ৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ডিসমিসড’।
অর্থাৎ খারিজ। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে
আলম এবং আসামিপক্ষে খন্দকার মাহবুব হোসেন ও মুহাম্মদ শিশির মনির।২০১৩ সালের ৯ মে
কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের
নভেম্বরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল
বিভাগের এই বেঞ্চ। ওই রায়ের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে আসামিপক্ষ। মুহাম্মদ
কামারুজ্জামান ১৯৭১ সালে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী
ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান। সে সময় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা
করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতা-কর্মীদের
নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। এই বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর,
নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।
মামলার শুরু থেকে শেষ : ২০১০ সালের ২৯ জুলাই
গ্রেফতার হন কামারুজ্জামান। ওই বছরের ২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক
দেখানো হয় তাকে। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর প্রসিকিউশনে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল
করে তদন্ত সংস্থা। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক
অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দাখিল করে প্রসিকিউশন। অবিন্যস্ততার কারণে পরবর্তীতে সেটি
ফিরিয়ে দেন ট্রাইব্যুনাল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল
করে আবারও। পরে আনুষ্ঠানিক এ অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে মামলাটি
স্থানান্তরিত হয় ট্রাইব্যুনাল-২-এ। গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ
মানবতাবিরোধী অপরাধের সাত অভিযোগে কামারুজ্জামানের বিচার শুরু হয় ২০১২ সালের ৪
জুন। ২০১৩ সালের ৯ মে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও
বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালের আদেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া
হয় তাকে। একই বছরের ৬ জুন তিনি আপিল করলেও সরকারপক্ষ কোনো আপিল করেনি। আপিল শুনানি
শুরু হয় গত বছরের ৫ জুন। শুনানি শেষে ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর রায় অপেক্ষমাণ রাখার
পর একই বছরের ৩ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। ১৮ ফেব্র“য়ারি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে
আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা। মার্চের প্রথম দিকে রিভিউ আবেদন দাখিলের পর আপিল
বিভাগে এর শুনানি হয় ৫ এপ্রিল। গতকাল সে আপিল খারিজের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন আদালত।
সারা দেশে কড়া
নিরাপত্তা জোরদার : মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত
কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকরের আগাম সতর্কতা হিসেবে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা
ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হুইসল বাজিয়ে রাস্তায় টহলে
নেমেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা। বিশেষ টহলে রয়েছে এলিট ফোর্স র্যাব
ও পুলিশ। প্রস্তুত রাখা হয়েছে র্যাবের হেলিকপ্টার। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র।এদিকে, আদালতের রায়ের পর থেকেই জামায়াত-শিবির
অধ্যুষিত জেলাগুলোয় কর্ডন পদ্ধতিতে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। অভিযানকালে
নোয়াখালীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন নিহত ও পাঁচ পুলিশসহ সাতজন আহত হয়েছেন।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজনসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জে বাসে
জামায়াত-শিবির সদস্যদের আগুন, পালানোর সময় গণধোলাইয়ের শিকার এক শিবির কর্মী ও
সাতক্ষীরায় এক জামায়াত কর্মীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাত
৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সারা দেশ থেকে অভিযানে শতাধিক আটক হয়েছেন। অভিযান
দীর্ঘ সময় চলবে। এদিকে যুদ্ধাপরাধ মামলার সংশ্লিষ্ট বিচারক, আইনজীবী, সাক্ষী,
প্রসিকিউটর এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তির
নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে বহু স্থাপনায় বসানো হয়েছে সিসি
ক্যামেরা। গতকাল সকালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে
ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। এর প্রতিবাদে
জামায়াত আজ ও কাল সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দেয়।স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি
গুরুত্ব বিবেচনা করেও অনেক জায়গায় বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা থাকছে। বাড়ানো
হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতাও। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে
জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী হরতালের ডাক দেওয়ার পর থেকেই সারা দেশে অতিরিক্ত পুলিশ
ও র্যাবের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারকে ঘিরে। কারাগারের চারদিকে অন্তত ৫০টি উঁচু ভবনের ছাদে
বসানো হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। কারাগারের চারদিকে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে
নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আশপাশের রাস্তাগুলোয় যানবাহন চলাচলের ওপর বিধিনিষেধও
আরোপ করা হয়েছে। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে বাড়তি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চলছে।
সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বস্তুতে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে দফায় দফায় তল্লাশি চালানো
হচ্ছে। অযাচিত ব্যক্তি ও যানবাহন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশে প্রবেশ করতে
দেওয়া হচ্ছে না। এ ব্যাপারে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ
বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। পাশাপাশি
নানা ধরনের বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
গণজাগরণ মঞ্চের অবস্থান
:মৃত্যুদণ্ডের
বিরুদ্ধে কামারুজ্জামানের করা রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে রায় বহাল থাকায় অবিলম্বে
ফাঁসি কার্যকরের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল শাহবাগ
জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত
শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। রায় কার্যকরের দাবিতে গতকাল সকাল
থেকেই শাহবাগে অবস্থান নেন মঞ্চের নেতা-কর্মীরা।
মুজাহিদ ও সাকার আপিল
কার্য তালিকায় : মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে
ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির
সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিল শুনানির জন্য কার্য তালিকায় এসেছে। গতকাল
বিকালে সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, মামলা দুটি আপিল বিভাগের আজকের কার্য
তালিকায় রয়েছে।
-
See more at:
http://www.bd-pratidin.com/first-page/2015/04/07/73369#sthash.rGKdVJD2.dpuf
Tag :
যুদ্ধাপরাধ



0 Komentar untuk "কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ - মৃত্যুদণ্ড বহাল"