বাংলার মুক্তকন্ঠ; মুক্তচিন্তা হোক মঙ্গলের, সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত।

সোহাগপুর বিধবাপল্লির ‘বুকের আগুন নিভছে’

সোহাগপুর বিধবাপল্লির বুকের আগুন নিভছে
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি | আপডেট: ০৩:০১, এপ্রিল ১২, ২০১৫ |
প্রথম আলো এ প্রকাশিত সরাসরি পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 



চুয়াল্লিশ বছর ধইরা বিচারের আশায় আল্লাহর কাছে দুই হাত তুইলা কানছি। মাইনষের কাছে চাইয়া মাইগা দিন কাডাইছি। কষ্টের কতা কেওরে কইবার পাইছি না। বুকের কষ্ট বুকের মধ্যে রাখছি। হেই কষ্ট আইজ থাইকা দূর অইছে। বুকের আগুন নিভছে। অহন থাইকা আর কানতাম না। আমরা ন্যায়বিচার পাইছি।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর গতকাল শনিবার রাতে এ কথা বলেন নালিতাবাড়ীর সোহাগপুর গ্রামের বিধবাপল্লির হাফিজা বেওয়া (৬৫)। তখন তাঁর চোখ দুটি ছলছল করছিল।
একাত্তরের ২৫ জুলাই সোহাগপুর গ্রামে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদর, রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ করে। বেনুপাড়ার পুরুষদের হত্যা করে পাড়াটিকে পরিণত করা হয়েছিল বিধবাপল্লিতে। সেদিন যে ৫৭ জন বিধবা হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে হাফিজাসহ ৩০ জন এখনো বেঁচে আছেন। সেই দিনের গণহত্যায় হাফিজা হারিয়েছিলেন সাতজন স্বজনকে
স্বামী, ভাশুর, দুই চাচা, দুই চাচাতো ভাই ও বোন জামাইকে।
সোহাগপুর বিধবাপল্লিতে গিয়ে দেখা গেল, তিনজন চৌকিদার নিয়োগ করা হয়েছে হাফিজার বাড়ির পাহারায়। তাঁরা জানান, কিছুক্ষণ পর পর পুলিশের টহল দল এসে খোঁজখবর নিচ্ছে।
হাফিজা বলেন,
টাইবোনালে সাক্ষী দেওয়নের পর থাইকা সবসুমু দুশ্চিন্তায় থাকতাম। পাড়া প্রতিবেশীরা ডর দেহাইতো। আল্লার কাছে নামাজ পইড়া দোয়া করতাম, যারা আমগর স্বামী, ভাই, চাচাগরে বিনাপরাধে মারছে, তাগর যেন শাস্তি অয়। আল্লাহ আমগর কথা হুনছে।
কথা হয় বিধবাপল্লির হাসেন বানু (৭০), করফুলি বেগম (৭০), জবেদা বেগম (৬০) ও অজুফা বেওয়ার (৭০) সঙ্গে। কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়কে ন্যায়বিচার দাবি করে সবাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
অজুফা বেওয়া বলেন,
ছোডু ছোডু পাঁচ পুলাপুরি থইয়া তার বাপরে গুলি কইরা মাইরা হালাইছিল। বুঝমান অইয়া বাপ কী জিনিস পুলাপুরি বুঝবার পাইছে না। অহন যারা বাপ আরাইলো তারা বুঝব বাপ আরানির কী জ্বালা। এটুকু বলেই দুই চোখ আঁচল দিয়ে মুছতে থাকেন অজুফা। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তিনি বলেন, বিচার পাইছি। আমরা খুশি আছি।
শহীদ পরিবারের সন্তান কফিল উদ্দিন বলেন,
কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে যারা আমার বাবাসহ ১৮৭ জন নিরীহ গ্রামবাসীরে মারছিল, আইজ এই ফাঁসি হওয়ায় বাবার আত্মাসহ সেই দিনের সকল শহীদের আত্মা শান্তি পাবে। এই বিচারে প্রমাণ অইলো সত্যের মরণ নাই।
বিধবাপল্লি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কামারুজ্জামানের ফাঁসি হওয়ায় কলঙ্কমুক্ত হলো সোহাগপুর গ্রাম।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে তৃতীয় অভিযোগ হলো সোহাগপুরের হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার: শেরপুরের মাটিতে কামারুজ্জামানের লাশ দাফন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। গতকাল সন্ধ্যায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকীর হোসেনের অনুরোধে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারা এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের শেরপুর জেলা ইউনিট কমান্ডার আ স ম নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থার অনুরোধে তাঁরা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তবে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় আজ রোববার সকালে জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলায় আনন্দ মিছিল করা হবে বলে তিনি জানান।
৬ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ঘোষণা দিয়েছিল, কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরে দাফন করতে দেওয়া হবে না।


0 Komentar untuk "সোহাগপুর বিধবাপল্লির ‘বুকের আগুন নিভছে’"

KANGLA ONLINE

Copy Protected by Surozeet Kumar Singha.

ONLINE RADIO 1

FM Radio of Bangladesh

RADIO 3

RADIO 4

BREAKING NEWS

Back To Top