বাংলার মুক্তকন্ঠ; মুক্তচিন্তা হোক মঙ্গলের, সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত।

বদর নেতার ফাঁসি - সমকাল

বদর নেতার ফাঁসি
কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো শনিবার রাতে
প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সাহাদাত হোসেন পরশ, ওয়াকিল আহমেদ হিরন, ইন্দ্রজিৎ সরকার ও আতাউর রহমান।



যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানকে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মিত স্থায়ী ফাঁসির মঞ্চে দণ্ড কার্যকর করে লাশ ২০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয়। ১০টা ৫১ মিনিটে ফাঁসির মঞ্চ থেকে কামারুজ্জামানকে নামানোর পর চিকিৎসক তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এর পর সম্পন্ন হয় ময়নাতদন্ত। পরে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে কারাগার থেকে রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে পুলিশি পাহারায় গ্রামের বাড়ি শেরপুরের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কামারুজ্জামানের ইচ্ছা অনুযায়ী শেরপুরের বাজিতকিলায় এতিমখানার পাশে তার লাশ দাফন করার কথা। কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ 
কার্যকর করা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এটা দ্বিতীয় ফাঁসির ঘটনা। এ রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের কলঙ্কমোচনে আরও একবার বাঙালি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। রাত ১টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শেরপুরে লাশ দাফনের প্রক্রিয়া চলছিল।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, সব প্রক্রিয়া শেষে শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান 'বদর নেতা' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে হত্যার দায়ে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসির রায় কার্যকর করার খবর জানতে দেশ-বিদেশের কোটি কোটি বাঙালি টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেন। বিকেল থেকেই রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে যান চলাচল কমে যায়। সন্ধ্যার পর থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারাগারের বাইরে র‌্যাব-পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তাব্যুহ তৈরি করেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থায় থাকে বিজিবি-পুলিশ-র‌্যাব। রায় কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়লে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। আনন্দ মিছিল হয়েছে বিধবাপল্লী হিসেবে পরিচিত শেরপুরের সোহাগপুরে। 
রাত পৌনে সোয়া ১০টার দিকে কেন্দ্রীয় কারা মসজিদের ইমাম মনির হোসেন কামারুজ্জামানকে তওবা পড়ান। রাত ১০টার দিকে কামারুজ্জামানকে গোসল করানো হয়। তিনি নামাজ আদায় করেন। এরপর ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। প্রথা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী তার হাতে রাখা একটি লাল রুমাল মাটিতে ফেললে প্রধান জল্লাদ রাজু ফাঁসির মঞ্চের লিভার (লোহার তৈরি বিশেষ হাতল) টান দেন। এতে কামারুজ্জামানের পায়ের নিচ থেকে কাঠের পাটাতন সরে গেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ২০ মিনিট ঝুলে থাকার পর ১০টা ৫১ মিনিটে তাকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে নামানো হয়।
কারাগার সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে একে একে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল ফজলুল কবীর, ঢাকা জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন, ডিবির ডিসি শেখ নাজমুল আলম, সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ও কারা চিকিৎসক আহসান হাবীব। 
এর আগে গতকাল বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৮ নম্বর কনডেম সেলের সামনে যান কামারুজ্জামানের স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ ২০ স্বজন। প্রায় সোয়া ঘণ্টা 'শেষ সাক্ষাৎ' শেষে কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল কারাফটকে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, 'প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার মালিক আল্লাহ_ রাষ্ট্রপতি নন। আমার বাবা প্রাণভিক্ষা চাইলে আল্লাহর কাছে চাইতেন।'
'সহিংসতা করতে বারণ' :মৃত্যুদণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় আবেগতাড়িত হয়ে কোনো কর্মসূচি না দিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কামারুজ্জামান। অতীতে জামায়াতের সংস্কার চেষ্টা চালানো এই নেতা কনডেম সেলে থেকে মৃত্যুর আগে স্বজনের কাছে জানিয়েছেন, 'ছাত্রশিবিরকে বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। মৃত্যুর পর হরতালে যেন সহিংসতা না হয়।'
কারা কর্তৃপক্ষের ফোন পেয়ে বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৮ নম্বর কনডেম সেলের সামনে যান কামারুজ্জামানের স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ ২০ স্বজন। হাসান ইকবাল জানান, সেলের অভ্যন্তরে ৩৫ মিনিট স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান কামারুজ্জামান। রীতি অনুযায়ী, পরিবারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে ফটক খুলে দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের আলিঙ্গন করেন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যরা নীরব থাকলেও তার একমাত্র মেয়ে আতিয়া নূর (১০) বাবাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
কারাফটকে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের হাসান ইকবাল বলেন, আব্বা সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। হাসিমুখে তাকে বিদায় জানিয়েছি। আব্বা শেষ ইচ্ছায় বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ী দেখতে চেয়েছেন। আশা প্রকাশ করেছেন, জামায়াত ও শিবির যে আন্দোলন করছে, তা চলমান থাকবে। আমাদের সত্যের পথে অবিচল থাকতে হবে।
কামারুজ্জামানের ছেলের অভিযোগ_ দুই ম্যাজিস্ট্রেট তার বাবার সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিথ্যা প্রচার করেছে। একাত্তরে আমার বাবার বয়স ছিল ১৮ বছর। তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে যুদ্ধাপরাধী সাজিয়ে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। সাজা দেওয়া হয়েছে। এর উপযুক্ত জবাব নতুন প্রজন্ম দেবে। 
কামারুজ্জামানের স্ত্রী নুরুন্নাহার, ছেলে হাসান ইকবাল, মেজ ছেলে হাসান ইমাম ওয়াফি, ছোট ছেলে আহামদ হাসান, মেয়ে আতিয়া নূর, বড় ছেলের স্ত্রী, বড় ভাই কফিলউদ্দিন, ভাতিজা জিতু, ভাতিজি মলি ও দুই ভাগনিসহ ২০ সদস্য দেখা করার সুযোগ পান। কারাগার থেকে বেরিয়ে তাদের কয়েকজনকে আঙুল উঁচিয়ে বিজয়চিহ্ন দেখাতেও দেখা যায়।
প্রধান জল্লাদ রাজু :ফাঁসির মঞ্চের আনুমানিক ২০ গজ দূরেই ৮ নম্বর কনডেম সেল থেকে কারা কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে তিনজন জল্লাদ একাত্তরের কুখ্যাত বদরপ্রধান কামারুজ্জামানকে বের করে আনেন। হাঁটিয়েই তাকে নেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। কাঠের পাটাতনের ওপর কামারুজ্জামানকে দাঁড় করিয়ে রাখে তারা। অন্য এক জল্লাদ হাত-পা আটকে মাথায় জমটুপি পরিয়ে দেয়। ফাঁসির দড়িটিও পরানো হয় গলায়। ততক্ষণে শুরু হয়ে যায় সময় গণনা। ফাঁসির মঞ্চের লিভারে (বিশেষ ধরনের লোহার চাবি) হাত রাখে জল্লাদ রাজু। জল্লাদ রাজু একাধিক মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এর আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্যানেলে নাম থাকলেও এবার সেই রাজু প্রধান জল্লাদের দায়িত্ব পালন করে। পুরো কাজে তাকে পল্টু, সাত্তার ও মাসুম সহায়তা করে। তারা সবাই যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
যত অভিযোগ :একাত্তরের শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে নির্যাতনের পর হত্যার দায়ে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। এরপর বিচারিক আদালত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এ রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গতকাল শনিবার এ দণ্ড কার্যকর করা হয়। প্রমাণিত প্রথম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকসেনাদের নিয়ে সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে। কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে এবং তার পরামর্শে পরিকল্পনায় সেদিন ওই গ্রামে নাম জানা ৪৪ জনসহ ১৬৪ পুরুষকে হত্যা করা হয়। ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয় ১৭০ নারীকে। ওই ঘটনার পর থেকে এলাকায় সোহাগপুর গ্রাম 'বিধবাপল্লী' নামে পরিচিত। অপর অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৩ আগস্ট আসামির নির্দেশে আলবদর সদস্যরা গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে ধরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে স্থাপিত আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে কামারুজ্জামান ও আলবদররা তাকে গুলি করে হত্যা করে। রায়ে বলা হয়, হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনে ধর্মান্তরকরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটির মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, যার মধ্যে অভিযোগের ৩ ও ৪ নম্বরে দুটি হত্যাকাণ্ড রয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং :রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে কারাগার থেকে দুটি অ্যাম্বুলেন্স বের হয়। একটিতে ছিল কামারুজ্জামানের লাশ। অ্যাম্বুলেন্স দুটির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি করে গাড়ি ছিল। ওই বহরে ডেপুটি জেলার আখেরুল ইসলামও ছিলেন। কঠোর নিরাপত্তায় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স শেরপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কামারুজ্জামানের মরদেহ শেরপুর নেওয়ার পথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক থানা পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। রাত পৌনে ১২টার দিকে কারাফটকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী জানান, প্রাণভিক্ষার আবেদন না করায় কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।


0 Komentar untuk "বদর নেতার ফাঁসি - সমকাল"

KANGLA ONLINE

Copy Protected by Surozeet Kumar Singha.

ONLINE RADIO 1

FM Radio of Bangladesh

RADIO 3

RADIO 4

BREAKING NEWS

Back To Top