ফাঁসিতে
ঝুললেন কামারুজ্জামান
লিটন হায়দার ও সুমন মাহবুব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 2015-04-11 22:18:25.0 BdST Updated: 2015-04-11
রিভিউ আবেদন খারিজ শেষে দুই দফায় আত্মীয়-স্বজন এবং এক
দফায় আইনজীবীদের সাক্ষাতের সুযোগ দিয়ে শনিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয়
কারাগারে ৬৫ বছর বয়সী এই জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে ঢাকার পুলিশ
কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান।
পৈত্রিক এলাকা শেরপুর সদরের কুমরি বাজিতখিলায় ইতোমধ্যে
কামারুজ্জামানের দাফনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে স্বজনরা। তার ইচ্ছা অনুযায়ী এ
প্রক্রিয়া সারা হয়েছে বলে কামারুজ্জামানের বড় ভাই কফিল উদ্দিন দুদিন আগেই
জানিয়েছিলেন।
বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে গত ৬ এপ্রিল রায়
পুনর্বিবেচনার আবেদনও খারিজ হয়ে গেলে কামারুজ্জামানের সামনে কেবল অপারাধ স্বীকার
করে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ বাকি থাকে। এই জামায়াত নেতা তা না চাওয়ায় শুক্রবার
সন্ধ্যায় নাজিম উদ্দিন রোডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয় ফাঁসির মঞ্চ তৈরির
তোড়জোড়।
মঞ্চের জন্য অন্তত আটটি বাঁশ, বড় আকারের তিনটি কার্টন,
ত্রিপল নেওয়ার পর দণ্ড কার্যকরের আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ শনিবার
পর্যন্ত গড়ায়।
শনিবার সকালে কারা কর্তৃপক্ষ কামারুজ্জামানের স্বজনদের
দেখা করতে বিকালে কারাগারে যেতে বলে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চাননি এই
যুদ্ধাপরাধী।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় প্রথম মৃত্যুদণ্ড
কার্যকরের আগে দণ্ডিত জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাও রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা
চাননি বলে জানানো হয়েছিল।
সোমবার কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে তার ছেলে
হাসান ইকবাল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেই ক্ষমা চাওয়া, না
চাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তার বাবা।
এর মধ্যে রিভিউ আবেদন খারিজের রায় বুধবার কারাগারে পৌঁছে
যায়। এতে দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনি বাধাও কাটে। কামারুজ্জামানকে রায় পড়ে
শোনানো হলে তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। সেই সুযোগও তাকে দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার কামারুজ্জামানের পাঁচ আইনজীবী কারাগারে তার
সঙ্গে কথা বলে এসে সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে ‘চিন্তা-ভাবনা’ করে সিদ্ধান্ত
জানাবেন তিনি।
এই ‘চিন্তা-ভাবনা’ কার্যত সময়ক্ষেপণের
কৌশল বলে বিভিন্ন মহল থেকে মন্তব্য আসে। এরপর শুক্রবার সকালে দুজন ম্যাজিস্ট্রেট
কারাগারে যান কামারুজ্জামানের কথা শুনতে।
কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন
কি না- জানতে চাইলে শুক্রবার রাতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তাকে আর সময় দেওয়া
হচ্ছে না।”
এরপর শনিবার বিকালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তিনি (কামারুজ্জামান)
মার্সি পিটিশন করতে চাননি।”
স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনরা বিকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে
গিয়ে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা কামারুজ্জামানের সঙ্গে কাটান। বেরিয়ে এসে
কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, “তিনি (কামারুজ্জামান)
ধীর রয়েছেন, সুস্থ রয়েছেন।”
পরিবারের সদস্যরা দেখা করে বেরিয়ে আসার পর কারা ফটকে
অবস্থান নেয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্য। নাজিমুদ্দিন রোডে যান চলাচল বন্ধ
করে দিয়ে কারা ফটকে বসানো হয় আর্চওয়ে। পুরো পরিস্থিতি রাতেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের
প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিতে শুরু করে।
রাত সোয়া ৯টার দিকে কামারুজ্জামানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা
সম্পন্ন হয়। মৌলভী এসে ইসলামী রীতি অনুযায়ী আসামিকে তওবা পড়ান। মৃত্যুদণ্ড
কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কারাগারের ভেতর ঢোকেন তার আগেই।
এরপর কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয় জামায়াতের এই
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলকে, একাত্তরে যিনি ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের আলবদর নেতা।
রাত ১০টা ১ মিনিটে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার
ক্ষেত্রে রিভিউ খারিজের দিনই দণ্ড কার্যকর হয়েছিল। সেই হিসাবে কামরুজ্জামান ছয় দিন
বেশি সময় পেয়েছেন।
যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড দ্রুত কার্যকরে দেশে গণজাগরণ মঞ্চসহ
বিভিন্ন দল ও সংগঠনের দাবি এবং এর বিপরীতে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের
আপত্তির মধ্যেই এই যুদ্ধাপরাধী ফাঁসিতে ঝুললেন।
তবে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ জানিয়ে এই
যুদ্ধাপরাধীকে দ্রুত ফাঁসিকাষ্ঠে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন শেরপুরের নালিতাবাড়ির
সোগাগপুরের বিধবাপল্লীর বিধবারা।
একাত্তর সালের ২৫ জুলাই ভোরে সোহাগপুর গ্রামের ১২০ জন
পুরুষকে হত্যা করা হয়; ধর্ষণের শিকার হন গ্রামের নারীরা। এক গ্রামে একসঙ্গে এতজন
পুরুষ নিহত হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ নারীকে অকালে বৈধব্য নিতে হয়েছিল বলে সোহাগপুরের
নাম হয়ে যায় ‘বিধবাদের গ্রাম’।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের ৯ মে দেওয়া
রায়ে যে দুটি অপরাধে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল
সোহাগপুরের এই গণহত্যা।
ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামান আপিল
করলে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারে একটি অপরাধে সাজা কমে যাবজ্জীবনে নামলেও সোহাগপুরের
গণহত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ডই বহাল থাকে।
২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর দেওয়া ওই রায়ে আপিল বিভাগ বলে, “একমাত্র জানোয়ার ছাড়া
আর কিছুর সঙ্গে অভিযুক্তের (কামারুজ্জামানের) কর্মকাণ্ডের তুলনা চলে না।”
বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি
আপিল বিভাগের ওই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায় পুনর্বিবেচনায় কামারুজ্জামানের
আবেদনের শুনানির জন্য সময় চাইলে তা-ও দেয় আপিল বিভাগ।
এরপর গত ৬ এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ করে আপিল বিভাগ রায়
দেয়, দুদিন পর বিচারকদের স্বাক্ষর সম্বলিত রায়ের অনুলিপি যায় কারাগারে।
বদর কমান্ডার থেকে শিবির সভাপতি
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ
কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলায় জন্ম নেন। ১৯৭১
সালে তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ
জেলার প্রধান।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা
করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের
নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। এই বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর,
নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।
স্বাধীনতার পরের বছর ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা
বিভাগ থেকে থেকে মাস্টার্স পাস করার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমনের আমলে ১৯৭৮-৭৯
সালে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে
ইসলামীতে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর রুকনের দায়িত্ব পান।
১৯৮২-১৯৮৩ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক
সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন।
একসময় জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য পদে থাকলেও যুদ্ধাপরাধের
বিচার শুরুর পর গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
১৯৯২ সাল থেকে তিনি দলে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের
দায়িত্বে ছিলেন।
বিচার পরিক্রমা
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী
অপরাধের বহু প্রত্যাশিত বিচার কাজ শুরু হয়।
ওই বছর ২১ জুলাই কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত
শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত দল। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলায়
একই বছর ২৯ জুলাই তাকে গ্রেপ্তারের পর ২ অগাস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়
গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে
কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছিল ২০১২ সালের ৪ জুন। প্রসিকিউশনের
পক্ষে এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৮ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন
পাঁচজন।
২০১৩ সালের ৯ মে হত্যা ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী
অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এটি ছিল ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের
যুদ্ধাপরাধের তৃতীয় রায়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত বছরের
৬ জুন আপিল করেন কামারুজ্জামান। গত ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে গত
১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এর এক মাস ১৬ দিনের
মাথায় রায় হয়।
[এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন কামাল
তালুকদার, গোলাম মুজতবা ধ্রুব, কাজী মোবারক হোসেন, নয়ন কুমার, তানভীর আহমেদ]
নিউজটি
সরাসরি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
Tag :
যুদ্ধাপরাধ



0 Komentar untuk "ফাঁসিতে ঝুললেন কামারুজ্জামান"