এই সংবাদ সম্মেলন ডাকার আসল কারণটা কী
১৫
মার্চ, ২০১৫ ইং
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ দু’মাস
অবরোধবাসিনী থাকার পর হঠাত্ সংবাদ সম্মেলন ডাকায় আশান্বিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম,
দেশময় তার ডাকা অবরোধ ও হরতালের ব্যর্থতা দেখার পর তার সম্ভবত সম্বিত ফিরে এসেছে
এবং তিনি সংবাদ সম্মেলনে নতুন কথা শোনাবেন এবং ব্যর্থ হরতাল ও অবরোধের বদলে দাবি
আদায়ের জন্য গণসমর্থিত শান্তিপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবেন। বেগম জিয়া হরতাল
ডাকলেই ঢাকার রাজপথে যানবাহন চলাচল আরো বেড়ে যায়; বিএনপি’র লোকদের
মালিকানাধীন দোকান, অফিস, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোও চালু থাকে, বিএনপি সমর্থকেরাও
রাজপথে গাড়ি নামান, এই বাস্তব অবস্থা দৃষ্টে বেগম জিয়া গত শুক্রবারের সংবাদ
সম্মেলনে তার রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তনের ঘোষণা দেবেন এটাই আশা করেছিলাম। আমার মতো
অনেকেই সম্ভবত এই আশা করেছিলেন। আমাদের কারো আশাই পূর্ণ হয়নি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তথা মিত্রপক্ষ যখন
হিটলারের নািস সেনাদের হাতে ক্রমাগত পরাজয় বরণ করছিলো, তখন ব্রিটিশ মিডিয়া এই
পরাজয়ের কথা কাউকে জানতে দিতে চাইতো না। তারা এই পরাজয় ঢাকার জন্য একটি নতুন কথা
বয়েন করেছিল। কথাটি হলো ‘successful retreat’ বা ‘সাফল্যজনক পশ্চাত্পসরণ।’ ডানকার্কে জার্মান সৈন্যদের হাতে শোচনীয় পরাজয়ের
পর অধিকাংশ ব্রিটিশ মিডিয়া খবরের হেডিং দিয়েছিল ‘ডানকার্ক থেকে ব্রিটিশ সৈন্যের সাফল্যজনক
পশ্চাত্পসরণ।
আমার বন্ধু ‘যায়যায়দিন খ্যাত’ শফিক রেহমান শুনেছি এখনো বেগম জিয়ার একজন কাছের উপদেষ্টা। তিনি
বাংলাভাষায় ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে কথা বলতে ও লিখতে ভালোবাসেন। তিনি চেষ্টা করলেই
হয়তো বেগম খালেদা জিয়াকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই কথাটি বলাতে পারতেন যে, গত দুই
মাস ধরে অবিরাম আন্দোলন (সন্ত্রাস) চালানোর পর বিএনপি সাকসেসফুল রিট্রিট করেছে। এই
ঘোষণায় পরাজয়ের কথা স্বীকারের বদলে এক ধরনের জয়লাভের দাবি জানানো যেতো এবং দেশের
মানুষও পেট্রোল বোমার ব্যর্থ রাজনীতির বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতো। কথায় বলে পচা
শামুকে পা কাটে। তেমনি প্রকৃত আন্দোলনে দেশের মানুষ ভয় পায় না। ভয় পায় ব্যর্থ
(পচা) আন্দোলনকে। যে আন্দোলন আসলে জনসমর্থন-বঞ্চিত সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু নয়। তাতে
নিরীহ মানুষ হত্যা ছাড়া কোনো সরকারের পতন ঘটানো যায় না। কোনো দাবি আদায় করা যায়
না। বিএনপি অতীতে হেফাজতি সন্ত্রাসের সময় তা পারেনি এবং এখনো পারছে না।
শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘যৌক্তিক
পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত তার আন্দোলন চলবে।’ এটা কি কোনো নতুন ঘোষণা? দিনের পর দিন তারাতো
হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়ে চলছেনই। হরতাল-অবরোধ হয় না, সন্ত্রাসে মানুষ মরে। যেদিন
হরতাল-অবরোধ থাকে না, সেদিনও পেট্রোল বোমা ছোঁড়া হয় এবং আগুনে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে
মারা হয়। বিএনপির নামে এই হরতাল-অবরোধ ডাকেন—তাদের কোনো নেতা। গোপন স্থান থেকে ঘোষণা দিয়ে তিনি
গোপন স্থানেই লুকিয়ে থাকেন। আন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্য রাজপথে বেরিয়ে আসেন না।
একই অবস্থা দলের নেতা-কর্মীদেরও। দলের ডাকা হরতাল-অবরোধে তাদেরও সাড়া দিতে দেখা
যায় না। তারা রাস্তায় নামেন না। ফলে শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনেও বেগম জিয়াকে দলের কর্মীদের
কাছে অনুরোধ জানাতে হয়েছে, ‘আপনাদের একটু কষ্ট হলেও আন্দোলনে আসুন। রাস্তায় নামুন। দলের
নেতা-কর্মীরাই যেখানে নেত্রীর ডাকে আন্দোলনে নামে না, সেখানে জনগণ নামবে সেই ভরসা
কোথায়?
তবু গত শুক্রবার সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়ে বেগম খালেদা বলেছেন, ‘আন্দোলন চলবেই।’ অর্থাত্
সন্ত্রাস চলবেই। তাতো গত দু’মাস ধরে চলছেই। নতুন করে এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য একটি সংবাদ সম্মেলন
ডাকার কোনো প্রয়োজন ছিল কি? সবচাইতে মজার কথা, তিনি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন; অথচ
সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে চাননি। একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করে তড়িঘড়ি
সংবাদ সম্মেলন শেষ করেছেন। তার লিখিত বক্তব্যে রয়েছে, ‘আন্দোলন
যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত চলবে।’
এই যৌক্তিক কথাটা বিএনপি নেত্রীকে তার কোনো উপদেষ্টা সম্ভবত শিখিয়ে
দিয়েছেন। এই যৌক্তিক কথাটার অর্থ জানা থাকলে আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস চালানোর
যৌক্তিকতা তিনি সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যা করতেন। তা তিনি করেননি বা করতে পারেননি।
ফলে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। আশা করা গিয়েছিল বর্তমান অবস্থা থেকে
দেশবাসীকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি সরকারের কাছে কিছু বাস্তব প্রস্তাব দেবেন।
তিনি তা দেননি। পুরনো দাবিগুলোই জাবর কেটেছেন। সংলাপ চাই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
অধীনে নির্বাচন চাই। সরকারকে গুম খুন ধরপাকড় বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি।
একই কথা নতুন বোতলে, ঢালা হলো মাত্র। সেই জানুয়ারি মাস থেকে বাসে,
কারে বোমা মারছে বিএনপি; পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, এমনকি পুলিশ
হত্যাও করছে। সন্ত্রাসীরা ধরা পড়লে গণপিটুনি খাচ্ছে, পুলিশের গুলিতেও মারা যাচ্ছে।
যেকোনো দেশেই সরকারকে জননিরাপত্তার জন্য এটা করতে হয়। বিএনপিও ক্ষমতায় থাকাকালে তা
করেছে। ক্রস ফায়ারের প্রবর্তন তারাই করেছে। এখন সন্ত্রাস দমনে পুলিশি ব্যবস্থাকে
গুম, খুন বলছেন বেগম জিয়া। তারা সন্ত্রাস বন্ধ করলেই এই তথাকথিত গুম খুন বন্ধ হয়ে
যায়। বেগম জিয়া সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের হত্যার রাজনীতির দায় চাপাতে চেয়েছেন
সরকারের ওপর। দেশের মানুষকে নিরেট বোকা মনে না করলে বেগম জিয়া এটা বলতে পারতেন না।
তার শাসনামলের বুদ্ধিজীবী হত্যা এখনো অব্যাহত রয়েছে তারই সহযোগী দল জামায়াতিদের
দ্বারা। বেগম জিয়া কি অভিজিত্ হত্যার দায়ও বর্তমান সরকারের ওপর চাপাতে চান? যেমন
চাপাতে চেয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদের হত্যা প্রচেষ্টার দায় তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী
লীগের ওপর?
মানুষ নিজের ছায়াই নিজের মনের দর্পণে দেখে। সেটাকে অন্যের বলে চালায়।
স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে পরিচিত জেনারেল এরশাদও এখন নিজের অতীতের ছায়া নিজের মনে
দেখতে পেয়ে আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। বলেছেন, “বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমার চাইতেও বড় স্বৈরাচারী”। যা হোক
এরশাদ সাহেব তবু নিজে যে স্বৈরাচারী ছিলেন সেকথা এতোদিনে হলেও স্বীকার করলেন।
কিন্তু বেগম জিয়া তার চাইতেও এক কাঠা দড়। তিনি হিটলারের সঙ্গে হাসিনার তুলনা
করেছেন। আসলে হিটলারের নািস দলের ছায়া দ্বারা যে তার দলটি গঠিত, এটি সম্ভবত তিনি
লুকাতে চেয়েছেন।
জার্মানীর নািসরা নিজেদের ন্যাশনালিস্ট বলতো; বাংলাদেশের বিএনপিও
তাই। নািস দলের মূল কার্যক্রম ছিল ইহুদী বিদ্বেষ প্রচার; বিএনপি’র মূল
কার্যক্রম দীর্ঘকাল ছিল ভারত (হিন্দু) বিদ্বেষ প্রচার। হিটলারের হাতে রোমা রোঁলা,
টমাসমানের মতো বিশ্ববিখ্যাত মনীষীরা নির্যাতিত হয়েছেন। অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা
করা হয়েছে। তাদের লেখা বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার শাসনামলে কিবরিয়া,
আহসানউল্লা মাস্টারসহ দেশের অসংখ্য বিশিষ্ট নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। কবি শামসুর
রাহমান ও হুমায়ুন আজাদের ওপর মৌলবাদী হামলা হয়েছে। শেখ হাসিনার ওপর হয়েছে ভয়াবহ
গ্রেনেড হামলা, যে হামলার একজন নেপথ্য নায়ক হিসাবে বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান
অভিযুক্ত। তারপরও হিটলারের সঙ্গে তার এবং তার দলের যে চরিত্র ও কার্যক্রমের মিল,
তা লুকাবার জন্য তিনি হিটলারের সঙ্গে শেখ হাসিনার মিল দেখাতে চান।
গত শতকের জার্মানীর ন্যাশনালিস্ট এবং বর্তমান শতকের বাংলাদেশের
ন্যাশনালিস্টদের চরিত্র ও কার্যক্রমের দিকে লক্ষ্য করলে তাদের মধ্যে আশ্চর্য মিল
দেখা যাবে। আন্দোলনের নামে নািস দলের কাজ ছিল সন্ত্রাস ও গুপ্তহত্যা। বাংলাদেশের
বিএনপি’রও তাই।
হিটলার গোপনে ভাড়াটে লোক দ্বারা জার্মান পার্লামেন্ট ভবন (রাইখস্ট্যাগ) পুড়িয়ে
দিয়ে দোষ চাপিয়েছিলেন জার্মানীর কম্যুনিস্ট পার্টি ও সোস্যালিস্ট পার্টির ওপর এবং
তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যা থেকে হাসিনা হত্যা প্রচেষ্টা পর্যন্ত
প্রত্যেকটি হত্যা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা নেতা থেকে বর্তমান নেতৃত্বের
অনেকেই। এই হত্যাকাণ্ড ও হত্যা প্রচেষ্টার কোনো সুরাহা না করে বেগম জিয়া দোষ
চাপিয়েছেন আওয়ামী লীগের ওপর। তার সুযোগ্য উপদেষ্টা শফিক রেহমানতো নিজের কাগজে
দীর্ঘ নিবন্ধ লিখে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন, শেখ হাসিনাই তার নিজের ওপর ভয়াবহ
গ্রেনেড হামলা চালিয়ে চেষ্টা করেছিলেন তার “লুপ্ত” জনপ্রিয়তা উদ্ধার এবং দেশবাসীর মধ্যে তার জন্য
সহানুভূতি সৃষ্টির। এই ধরনের গোয়েবল্সীয় প্রচারণা বিএনপি এখনো চালাচ্ছে।
এতো কিছু সত্ত্বেও বেগম জিয়ার গত শুক্রবারের প্রেস কনফারেন্স করার
আসল উদ্দেশ্যটি বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে। তিনিতো সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছেনই। ভাষা
শহীদের মাস (ফেব্রুয়ারি) এবং স্বাধীনতার (মার্চ) মাসেরও মর্যাদা রক্ষা করছেন না।
বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসে দেশের যতো সাধারণ মানুষ এবং তরুণ বুদ্ধিজীবী (ব্লগার)
নিহত হয়েছে, তাদের শহীদ ঘোষণা করে ঢাকায় একটি নতুন শহীদ স্তম্ভ তৈরি হতে পারে।
আমার ধারণা, আজ আওয়ামী লীগ তা না করলেও ভবিষ্যতে সন্ত্রাসমুক্ত দেশে অপর কোনো
গণতান্ত্রিক সরকার হয়তো তা করবেন।
আমার ধারণা, এই সংবাদ সম্মেলন ডাকার পেছনে যৌক্তিক কারণ আছে। খালেদা
জিয়ার ব্যবহূত যৌক্তিক কথাটা আমিও এখানে ব্যবহার করলাম। বিএনপি নেত্রীর মাথায় এখন
গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। তার পুত্র তারেক রহমানের কার্যকলাপও লন্ডনে এখন
নিয়ন্ত্রিত। লন্ডনের বাংলা পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, তারেক রহমানের বাংলাদেশি
পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তিনি তা নবায়নের জন্য লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে
যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এখন ব্রিটেনে তার শরণার্থীর স্টেটাস। ফলে ব্রিটিশ হোম অফিসও
নাকি তাকে রাজনৈতিক তত্পরতা থেকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
এই অবস্থায় আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস যে বেশিদিন চালিয়ে রাখা যাবে না
তা সম্ভবত বিএনপি নেত্রী বুঝতে পারছেন। তিনি দেশে অবরোধ ডেকে নিজে অবরোধবাসিনী
হয়েছেন। বিদেশে পুত্রের অবস্থাও তাই। বিএনপি’র অভ্যন্তরেও নীরব বিদ্রোহ পুঞ্জীভূত হচ্ছে।
যেকোনো সময় গঠিত হতে পারে বিদ্রোহী বিএনপি। চূড়ান্ত পরাজয় আসন্ন হলে একশ্রেণির
মানুষ যা করে অর্থাত্ পরাজয় ঢাকার জন্য জয়ের দম্ভ দেখায়। এই দম্ভ প্রকাশের জন্যই
হয়তো বিএনপি নেত্রীর এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা। ফলে তার কণ্ঠে পুরনো হুমকি ও দাবিরই
পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তিনি কোনো নতুন কথা বলতে পারেননি; সাংবাদিকদেরও প্রশ্নের উত্তর
দিতে চাননি।
লন্ডন ১৪ মার্চ, শনিবার, ২০১৫
Tag :
রাজনীতি



0 Komentar untuk "এই সংবাদ সম্মেলন ডাকার আসল কারণটা কী"