শিশুর জন্মত্রুটি : কারণ ও প্রতিরোধ
ডা. অর্জুনচন্দ্র দে
প্রকাশ : ১৪ মার্চ, ২০১৫
আবির-নওরীনের
দুই বছরের সংসারে আলো করে ফুটফুটে কন্যা সন্তান আদৃতা এল। প্রথম থেকেই তারা
চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। গর্ভকালীন পুরো নয় মাসের সময় শৃংখলাবদ্ধ জীবনের সঙ্গে,
উত্তেজনা আর স্বপ্নের মিশেলে দ্রুত কেটে গেল। কিন্তু শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার
পিঠের নিুভাগে মাঝামাঝি স্থানে দৃশ্যমান চাকার মতো একটি মাংসপিণ্ড দেখা গেল। মায়ের
কোলে দেয়া সম্ভব হয়নি নবজাতক আদৃতাকে, তৎক্ষণাৎ নিতে হল নবজাতক ওয়ার্ডে। চলল
পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চিকিৎসক জানালেন আদৃতার মস্তিষ্কেও সমস্যা, সেখানে পানি জমেছে।
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হবে।
উপরের
কাল্পনিক দৃশ্যপটটি আর কিছুই নয়, এটি একটি জন্মত্রুটি আক্রান্ত শিশু ও তার
পরিবারের কাহিনী। শিশুর জন্মের সময় ছোট-বড় যে কোনো ধরনের ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে
পারে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যে ত্রুটি দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে ঠোঁট কাটা, তালু
কাটা, পায়ের গোড়ালী বাঁকা ইত্যাদি প্রধান। এ ছাড়া কিছু শিশু হৃৎপিণ্ডে অস্বাভাবিক
ছিদ্র নিয়ে জন্মাতে পারে, যা সাধারণভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না। স্টেথোস্কোপের মাধ্যমে
শারীরিক পরীক্ষা ও ইকোকার্ডিওগ্রামের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। অনেক সময় ছোট ছোট
জন্মত্রুটি যেমন, কানের সামনে একটি ছোট মাংসপিণ্ড, হাতে অথবা পায়ে একটি অতিরিক্ত
আঙ্গুল ইত্যাদি দেখা যায়, যা তেমন মারাত্মক নয়। এ ছাড়া আরও অনেক জন্মত্রুটি রয়েছে
যেগুলো বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে হয়।
বিশ্বস্বাস্থ্য
সংস্থার হিসাব মতে, প্রতি ৩৩ জন নবজাতকের মধ্যে একজন কিছু না কিছু জন্মত্রুটি নিয়ে
জন্মায়। সে হিসাবে বছরে সারা বিশ্বে প্রায় ৩২ লাখ শিশু জন্মত্রুটিজনিত বিকলাঙ্গতায়
ভোগে। এদের মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজার শিশু জন্মের প্রথম মাসের মধ্যেই মারা যায়।
কারণ
সমীক্ষায়
দেখা যায়, প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই জন্মত্রুটির কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
অন্যদের ক্ষেত্রে কিছু কিছু কারণ গবেষণার মাধ্যমে নির্ণয় করা গেছে। এগুলোর মধ্যে
কয়েকটি নিুে আলোচিত হল :
আর্থ-সামাজিক
অবস্থা : তীব্র ধরনের জন্মত্রুটিগুলোর প্রায় ৯৪ শতাংশই মধ্য ও নিু আয়ের দেশে ঘটে
থাকে। এটি বোধগোম্য যে, এসব দেশে মায়েরা নানা ধরনের পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণজনিত
সমস্যায় বেশি ভোগেন। তাছাড়া মায়ের বয়স বেশি হওয়ার কারণে ডাউন সিনড্রোম নামক একটি
জন্মত্রুটি অধিক হারে দেখা যায়।
মায়ের
অসুস্থতা : গর্ভাবস্থায় মা যদি কিছু অসুস্থতায় ভোগেন তাহলে গর্ভজাত শিশু
জন্মত্রুটিতে আক্রান্ত হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, থাইরয়েডজনিত সমস্যা এর
মধ্যে অন্যতম।
বংশগত
: নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তানের মধ্যে বিরল কিছু বংশগত রোগের লক্ষণ দেখা
দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা উভয়েই রোগটির অস্তিত্ব প্রচ্ছন্নভাবে ধারণ করেন,
শিশুর মধ্যে এ লক্ষণ প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে।
সংক্রমণজনিত
রোগ : গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে গর্ভের প্রথমাংশে মা বিশেষ কিছু জীবাণু দ্বারা
আক্রান্ত হলে গর্ভস্থ ভ্রুণটি আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক বিকলাঙ্গ হয়ে পড়তে পারে। এ
ক্ষেত্রে রুবেলা, জলবসন্ত ইত্যাদি জীবাণুর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
মায়ের
পুষ্টিজনিত সমস্যা
মায়ের
পুষ্টিহীনতা অথবা স্থূলকায় শরীর দুই ক্ষেত্রেই শিশু জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মানোর
আশংকা থাকে। শরীরে ফলিক এসিড, আয়োডিন ইত্যাদির ঘাটতির জন্য শিশু মারাত্মক
জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে।
প্রতিরোধ
যদিও
অনেক ক্ষেত্রেই জন্মত্রুটি প্রতিরোধ করা সহজ নয়, তবু বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ
করলে মোটের উপর এই প্রাণঘাতী সমস্যা থেকে অনেক ক্ষেত্রে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
প্রজননক্ষম
নারীদের সব সময়ই পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। খাবার পছন্দের ক্ষেত্রেও খাবারের সব
উপাদান বিশেষ করে ভিটামিন, ফলিক এসিড ও খনিজ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। গর্ভের আগে ও
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তার
যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। রক্তে গ্লুকোজের অস্বাভাবিক মাত্রা শিশুর
জন্মত্রুটির কারণ হতে পারে। তাছাড়া অন্য অসুখ (যথা হাইপোথাইরয়েডিজম) থাকলে তার
উপযুক্ত চিকিৎসা করানো অত্যাবশ্যক।
কিছু
রোগের বিরুদ্ধে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে যাতে গর্ভকালে ওই রোগের মাধ্যমে শিশুর
জন্মত্রুটি হওয়ার আশংকা কমে যায়।
- See more at:
http://www.jugantor.com/stay-well/2015/03/14/234543#sthash.PlZHkuYe.dpuf
Tag :
স্বাস্থ্য



0 Komentar untuk "শিশুর জন্মত্রুটি : কারণ ও প্রতিরোধ"