সাকার ফাঁসি বহাল
আহমেদ আল আমীন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির
সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছেন বাংলাদেশ
সুপ্রিমকোর্ট। ১৯৭১ সালে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য
তাকে সর্বোচ্চ এই দণ্ড দেন আদালত। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের
মধ্য দিয়ে ডানঘেঁষা রাজনীতিতে সাকা চৌধুরীর অধ্যায় শেষ হবে এবার। চার সদস্যের একটি
বেঞ্চের পক্ষে জনাকীর্ণ বিচারকক্ষে গতকাল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। আপিল বিভাগের এই পঞ্চম রায়ে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী
অপরাধ মামলায় সর্বোচ্চ আদালতে প্রথমবারের মতো দণ্ডিত হলেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয়
কোনো নেতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত নয়টির মধ্যে আটটিই প্রমাণিত
হয়েছে আপিল বিভাগে। অন্যটিতে খালাস পেয়েছেন তিনি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাবেক
স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সাকা চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে সদস্য পদে
নির্বাচিত হয়েছেন ছয়বার। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিপরিষদের এই সদস্য সাবেক
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টাও ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ডে
রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করবে
বলে জানিয়েছে আসামি পক্ষ। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘এই রায় না হলে আমরা হতাশায় নিমজ্জিত হতাম।’ আসামি পক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব
হোসেন বলেন, ‘আমরা এই রায়ে হতাশ।’ সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী
বলেন, ‘একদিন প্রমাণিত হবে আমার বাবা নির্দোষ।’ এদিকে এ রায়ে বিএনপি বিস্ময় প্রকাশ করলেও
জনগণের প্রত্যাশিত রায় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আওয়ামী লীগ। রায়ের খবরে মিষ্টি
বিতরণ ও আনন্দ মিছিল হয়েছে চট্টগ্রামের রাউজানসহ বন্দরনগরী ও দেশের বিভিন্ন
স্থানে। এর আগে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড
কার্যকর করার নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের বিরুদ্ধে ওই
বছরের ২৯ অক্টোবর আপিল করে আসামি পক্ষ। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে আটক এই বিএনপি
নেতা এখন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার
নেতৃত্বে নির্দিষ্ট এই বেঞ্চের চার সদস্য এজলাসে আসন গ্রহণ করেন সকাল ৯টা ৪ মিনিটে।
এজলাসে প্রধান বিচারপতির ডানে বসেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বামে বিচারপতি
সৈয়দ মাহমুদ হোসেন; বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার ডানে বসেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ
সিদ্দিকী। এজলাস সামনে রেখে বিচারকক্ষের ডান দিকে বসেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে
আলম, বাম দিকে বসেন আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এস এম
শাহজাহান। আদালতে উপস্থিত ছিলেন আসামির দুই ছেলে ফাইয়াজ কাদের চৌধুরী ও হুম্মাম
কাদের চৌধুরীও। ৯টা ৫ মিনিটে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার পর এজলাস ত্যাগ করেন বেঞ্চের
সদস্যরা। রায় ঘোষণা উপলক্ষে আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশ এলাকায় ছিল কড়া
নিরাপত্তা।
ঐকমত্যের রায় : বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে
আপিল করেন সাকা চৌধুরী। আপিল নম্বর-ফৌজদারি আপিল ১২২/২০১৩। আপিল বিভাগে মামলাটি
পরিচালিত হয়-সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বনাম দ্য চিফ প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ
ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা, এই নামে। অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড জয়নুল আবেদীন ও মাহমুদা
পারভীন। সংক্ষিপ্ত রায়ে দেখা যায়, এই মামলার রায় হয়েছে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। এর আগে
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ
কামারুজ্জামান ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের রায় ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। দলের
আরেক নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মামলায় আপিলের রায়ও হয়েছে ঐকমত্যের
ভিত্তিতে।
ফিরে দেখা : মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাকা
চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় ২০১০ সালের ২৬ জুলাই। এর আগে অবশ্য নাশকতার
অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা থানায় মামলা হয় ওই বছরের ২৬ জুন। মামলায় একই
বছরের ১৬ ডিসেম্বর গ্রেফতার হন তিনি। ডিসেম্বরের ১৯ তারিখ মানবতাবিরোধী অপরাধের
অভিযোগে আটক দেখানো হয় তাকে। ৩০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো ট্রাইব্যুনালে হাজির করা
হয় তাকে। ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
দাখিল করে প্রসিকিউশন।
এবার পূর্ণাঙ্গ রায়ের
অপেক্ষা : সাকা
চৌধুরীর আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৩ দিন। এবার আপিলের
পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষা। পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর আসামি পক্ষের রিভিউ আবেদনের
নিষ্পত্তি শেষে আসবে দণ্ড কার্যকরের প্রসঙ্গ। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশে প্রচলিত
আইনে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। মানবতাবিরোধী অপরাধী আবদুল কাদের মোল্লার আপিলের
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশে সময় লেগেছে ৮০ দিন।
এই সেই সাকা চৌধুরী : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল
আলোচিত-সমালোচিত একটি নাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। সাকা চৌধুরী নামেও তিনি
পরিচিত। ব্যঙ্গবিদ্রৃপের মাধ্যমে যে কোনো বিষয়কে ব্যাখ্যায় তার জুড়ি মেলা ভার।
১৯৪৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার গহিরা গ্রামে জন্ম। বাবা ফজলুল
কাদের চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার। মা সেলিনা কাদের
চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী। বর্ণাঢ্য এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক
জীবনের অধিকারী এই সাকা চৌধুরী। জীবনভরই থেকেছেন আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে।
অন্যের সমালোচনার পাশাপাশি আত্মসমালোচনাও করেছেন কখনো কখনো। স্পষ্টবাদিতার জন্য
প্রশংসিত। কখনো অভিযুক্ত হয়েছেন অশ্লিল উচ্চারণের জন্য। তবে সব পরিচয় ছাপিয়ে একজন
পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে পরিচিতি পান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। সংসদে নিয়মিত ঝড়
তুলেছেন দীর্ঘ ৩৩ বছর। পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন
করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও। কিছুকাল কাটান
যুক্তরাজ্যের লিঙ্কনস ইন আর জর্জটাউন স্কুল অব ফরেন সার্ভিসে। পেশায় ব্যবসায়ী, এ
রাজনীতিবিদ তিন সন্তানের জনক। ১৯৭৮ সালে মুসলিম লীগে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতির
শুরু। ১৯৮৫ সালে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। ১৯৮৮ সালে নিজেই গঠন করেন এনডিপি। ১৯৯৬
সালে এনডিপি বিলুপ্ত করে যোগদেন বিএনপিতে। বিএনপি থেকে একবার বহিষ্কার হলেও
প্রত্যাবর্তন করেন আবার।
আমি ফেলনা নই : একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে
সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় রেডিওতে শুনে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
কাশিমপুর কারাগারের জেলারকে বলেছেন, তিনি ‘ফেলনা’ লোক নন, আইনের ‘সর্বোচ্চ লড়াই’ তিনি লড়বেন। বিডিনিউজ। গতকাল সকালে জেলখানায় বসেই
রেডিওতে নিজের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকার রায় শোনেন এই যুদ্ধাপরাধী। ২০১০ সালের ১৬
ডিসেম্বর গ্রেফতার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাকা চৌধুরী ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর
থেকে গাজীপুরের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এ বন্দী। এ কারাগারের সুপার সুব্রত কুমার
বলেন, ‘সকাল ৯টায় রায় হওয়ার পর জেলার মো. ফরিদুর
রহমান রেজা সাড়ে ১০টার দিকে সাকা চৌধুরীর সেলে যান এবং রায়ের কথা জানান। এর আগে
সাকা চৌধুরী রেডিওর মাধ্যমে নিজেও রায় শোনেন।’ কারাবিধি অনুযায়ী, কারাবন্দী আসামিরা তাদের
পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক ব্যান্ডের রেডিও সঙ্গে রাখতে পারেন। জেলার ফরিদুর
রহমান রেজা বলেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পরও সাকা ছিলেন ‘হাসি-খুশি’। তিনি বলেছেন, ‘তিনি আইনের সর্বোচ্চ লড়াই লড়বেন, রিভিউ আবেদন করবেন।’ “সাকা চৌধুরী আমাদের বলেছেন, ‘আমি দেশের জন্য, জনগণের জন্য রাজনীতি
করেছি। আমি তো ফেলনা লোক নই। আজ হয়তো আমার কিছু কথার কারণে অনেকেই ক্ষুব্ধ। আজ
আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে।” এরশাদ আমলের এই মন্ত্রী নিজেকে ‘নির্দোষ’ এবং ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার’ বলে দাবি করেছেন জেলারের সামনে।
-
See more at:
http://www.bd-pratidin.com/lead-news/2015/07/30/96578#sthash.uhwawnJD.dpuf
Tag :
যুদ্ধাপরাধ



0 Komentar untuk "সাকার ফাঁসি বহাল"