বাংলার মুক্তকন্ঠ; মুক্তচিন্তা হোক মঙ্গলের, সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত।

আলো নয় হতাশা

আলো নয় হতাশা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৫
রাশেদ মেহেদী ও রেজা মাহমুদ



নাশকতার আগুন, উৎকণ্ঠা, আশঙ্কামুক্ত শান্তির সকাল আর কতদূর? কবে হবে উৎকণ্ঠার অবসান? প্রধান রাজনৈতিক দুই পক্ষের ভেতর কি সমঝোতার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে? রাজপথে হরতাল দৃশ্যত অকার্যকর হলেও হরতালের কারণে এসএসসি পরীক্ষাসহ শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাবে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে ফের দুর্দিন নেমে এসেছে। আগের চেয়ে কমলেও এখনও বাসে বোমা ছোড়া, আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। ফলে জনমনে আতঙ্ক কাটছে না।
সবারই প্রত্যাশা ছিল, ৫২ দিন পর সংবাদ সম্মেলনে এসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংকট উত্তরণে বাস্তবসম্মত, নতুন কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। কিন্তু নাশকতানির্ভর, জনবিচ্ছিন্ন হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পুরনো সিদ্ধান্ত নতুন করে শুনিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন জনগণকে অনেকটা হতাশ করলেন। তার সংবাদ সম্মেলনের পর শনিবার ৭২ ঘণ্টার হরতালের সেই পুরনো বিবৃতি 'নতুন স্বাক্ষরে' এসেছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠেও সহিংসতা দমন এবং বিএনপি চেয়ার-পারসনকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতারের কঠোর বার্তা পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আবারও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পূর্ববর্তী সরকারের মতো একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। স্বভাবতই সাধারণ মানুষের সামনে আলোর রেখা নেই, আছে অন্ধকার। দেখেশুনে মনে হচ্ছে কেউ কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
বিশিষ্টজনের অভিমত, প্রকৃতপক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসন প্রায় দুই মাসের মাথায় পুরনো দাবি নতুন করে মনে করিয়ে দিতেই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন, এর বেশি কিছু নয়। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচি ঘিরে নাশকতার বিরুদ্ধে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সেই পুরনো সুরেই, প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় সরকারও দমননীতি আরও কঠোর করারই ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ক্ষমতার লড়াই যত দীর্ঘ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের সামনে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ততই বাড়ছে।
বিপর্যস্ত জনজীবন: চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তবে এবারের আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজপথে ছিলেন না নেতাকর্মীরা। প্রথমদিকে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল দেখা গেলেও পরে তাও আর দেখা যায়নি। বিএনপির প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা একেবারে নীরব ভূমিকা পালন করছেন, অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। আন্দোলনের প্রথম মাস নজিরবিহীন পেট্রোল বোমা হামলার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এ সময়ে সহিংসতায় প্রাণ দিয়েছেন ৮৯ জন, যার মধ্যে ৬৫ জনই পেট্রোল বোমার আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আরও দুই শতাধিক মানুষ দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন।
হরতাল-অবরোধে এ বছর জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রায় ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থী। পরীক্ষাকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের মানুষের অনুরোধ বিএনপি জোট একেবারেই আমলে নেয়নি; বরং পরীক্ষার তারিখ বেছে নিয়ে হরতাল দিয়ে পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য করা হয়েছে।
এফবিসিসিআইর হিসাবে গত প্রায় দুই মাসের হরতাল-অবরোধে ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। এ সময়ে আগুন দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার যানবাহনে। বন্ধ থেকেছে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, শুধু পরিবহন খাতে এখন ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। বিশেষ করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনে উঠেছে নাভিশ্বাস। চোরাগোপ্তা পেট্রোল বোমা ও হামলার ভেতরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে।
বিএনপি ও ২০ দলেও হতাশা: খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরেও হতাশা দেখা দিয়েছে। টানা অবরোধ আর লাগাতার হরতাল এখন জনজীবনে তেমন কোনো প্রভাব না ফেলায় নেতাকর্মীরা চেয়ারপারসনের কাছ থেকে নতুন আশার বাণী শুনতে চেয়েছিলেন। নতুন কোনো কর্মসূচিরও আশা করেছিল বিএনপি ও জোটের তৃণমূল। কিন্তু নতুন কিছু পাননি তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, গত ১৯ জানুয়ারির মতোই বক্তব্য রেখেছেন চেয়ারপারসন। একই সঙ্গে দীর্ঘ আন্দোলনেও উঁচু পদে থাকা যেসব নেতা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি চেয়েছিলেন মাঠের নেতাকর্মীরা। কিন্তু চেয়ারপারসন সেদিকেও যাননি। এ প্রেক্ষাপটে কেন তিনি নতুন করে সংবাদ সম্মেলনে পুরনো বক্তব্য রাখলেন, তা তারা বুঝতে পারছেন না।।
খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে কার্যালয়ে অবস্থানকারী নেতাদের বাইরে সিনিয়র নেতাদের উপস্থিত থাকতে না দেখেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নেতারা। তারা বলছেন, স্থায়ী কমিটির তিনজন নেতা ছাড়া সবাই বাইরে রয়েছেন।
বিশিষ্টজনের অভিমত: টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে যেমন নতুনত্ব ছিল না, তেমনি ছিল না প্রজ্ঞার ছাপও। নাশকতা নিয়ে তিনি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ওপর পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছেন, যেন তাদের কোনো দায়ই নেই। যে রাজনৈতিক কর্মসূচি অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে এবং বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, সে কর্মসূচিই চালিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন তিনি, এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পেল। এর ফলে প্রতিপক্ষের দোষারোপের পুরনো বক্তব্যের ফলে অনিবার্যভাবে যেটা হলো, সরকার পক্ষ থেকেও আন্দোলন দমনে আরও কঠোর ঘোষণা দেওয়া হলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, কর্মসূচি পুরনো থাকলেও সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন নতুন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কঠোর দাবি থেকে সরে এসে সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সরকার গঠনের কথা বলেছেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আহ্বান অনুযায়ী সংলাপ শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধাগুলো দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে সরকারকে নতুন করে চিন্তা করার এবং কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার 'স্পেস' দিয়েছেন। এখন সরকার সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটতে পারে।
0 Komentar untuk "আলো নয় হতাশা"

KANGLA ONLINE

Copy Protected by Surozeet Kumar Singha.

ONLINE RADIO 1

FM Radio of Bangladesh

RADIO 3

RADIO 4

BREAKING NEWS

Back To Top