মহারাসলীলা প্রেক্ষিত
ওয়াই সুরজিৎ সিংহ
![]() |
সিলেটে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত মণিপুরী রাসলীলা’র রাধা-কৃষ্ণ
|
মহারাসলীলা, মণিপুরী জাতিসত্বার এক ধর্মীয় সর্ববৃহৎ
উৎসব। পূর্ণ ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এ উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে
প্রায় আড়াই শত বৎসর ধরে। মণিপুরী ধ্রুপদী নৃত্যের অপূর্ব সমাহারে এ উৎসব উদযাপিত
হয় মণিপুরী অধ্যুষিত বিশ্বের প্রধাণ প্রধাণ মন্দিরে। ১৯৪২ইং সনে বাংলাদেশে প্রথম
মণিপুরী মহারাসলীলা উদযাপিত হয় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর
জোড়ামণ্ডপে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ইং থেকে মাধবপুর জোড়ামণ্ডপে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও
আদমপুরে মণিপুরী (মীতৈ) সম্প্রদায় কর্তৃক পৃথক পৃথকভাবে প্রতি বৎসর এই “মহারাসলীলা” মহোৎসব
উদযাপিত হয়ে আসছে। পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মত প্রকৃতির অপরূপ জেলা সিলেট শহরের লামাবাজারস্থ
শ্রী শ্রী কৃষ্ণ বলরাম জিউড় মন্দিরেও বাংলাদেশ মণিপুরী যুব কল্যাণ সংস্থা- বিএমজেকেএস
এর আয়োজনে আগামী ১৩ই নভেম্বর’০৮ইং
তারিখে উদযাপিত হতে যাচ্ছে এই “মহারাসলীলা” মহোৎসব।
![]() |
সিলেটে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত মণিপুরী রাসলীলা’র রাধা-কৃষ্ণ ও গোপীবৃন্দ
|
প্রথম মহারাসলীলা উদযাপিত হয় ১৭৭৯
খ্রীষ্টাব্দের কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে। মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নে ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে মহারাসলীলার নৃত্যের বিভিন্ন পর্যায় এবং পোষাক পরিকল্পনার
বিশদ বিবরণ পেয়েছিলেন। যা এযাবৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রথম “মহারাসলীলা” অনুষ্ঠানে মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র নিজেই ছিলেন
মূখ্য মৃদঙ্গ বাদক এবং মহারাণী হীরামতি গোপীপ্রধাণ ললিতার ভূমিকায় ও রাজকন্যা
বিম্বাবতী ছিলেন শ্রীমতি রাধারাণীর ভূমিকায়।
#
রাসনৃত্য সাধারণত পাঁচ ধরণের হয়ে থাকে –
১।
মহারাস- কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর) মাসের ভরা পূর্ণিমার রাতে অনুষ্ঠিত হয়
শ্রীমদভগবৎ এর পঞ্চমাধ্যায় মতে।
২।
কুঞ্জরাস- অগ্রহায়ন (নভেম্বর-ডিসেম্বর) মাসের পূর্ণ পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়।
৩। বসন্তরাস- ফাল্গুন (এপ্রিল) মাসের
পূর্ণ পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়।
৪। নিত্যরাস- যেকোন শুভ লক্ষণযুক্ত
রাত্রে।
৫।
দিবারাস- যেকোন লক্ষণযুক্ত দিনে।
![]() |
সিলেটে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত মণিপুরী রাসলীলা’র কৃষ্ণ
|
# এই
মহারাসলীলায় নিম্নোক্ত পর্যায়গুলো থাকে-
১।
বৃন্দা অভিসার।
২।
কৃষ্ণ অভিসার।
৩।
রাধা-গোপী অভিসার।
৪।
মণ্ডল সাজন।
৫।
গোপীগণের রাগ-আলাপ।
৬।
প্রধাণ ভঙ্গি পারেঙ
৭।
কৃষ্ণ নর্তন।
৯।
গোপীগণের বিভিন্ন ধরণের নৃত্য।
১০।
কৃষ্ণের অন্তর্ধান, প্রত্যাবর্তন,পুষ্পাঞ্জলী,
গৃহগমন।
![]() |
সিলেটে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত মণিপুরী রাসলীলা’র কৃষ্ণ
|
#
নরাসলীলায় অংশগ্রহণকারীদের পোষাক পরিচ্ছদের মধ্যে রাধা-গোপীগণের পরনে তাকে পলয়
(কারুকাজখচিত শিল্প সৌন্দর্য মন্ডিত পোষাক), যার বিভিন্ন অংশে
রয়েছে-
১।
কোকতুম্বি- যা মাথার উপর কারুকাজ করা কালো কাপড় দ্বারা বেষ্টিত থাকে।
২।
মাইখুম্বি- মুখের উপর পাতলা সাদা কাপড়ের আবরন বিশেষ।
৩।
থাবাকয়েৎ- ঘন সবুজ ভেলভেট ব্লাউজের উপরে সাদা কাপড়ের বন্ধনী বিশেষ।
৪।
খাংনপ- কোমর বন্ধনী বিশেষ।
৫।
খুনপ- হাতে ও বাহুতে বন্ধনী বিশেষ।
৬।
মাংদাবী- কোমরের সম্মুখভাগের অংশ বিশেষ।
৭।
খাওনবী- দুই কাধের উপর থেকে হাটু পর্যন্ত লম্বা
যা পলয়ের উপর ছড়ানো থাকে।
৮।
খুজি-নাচি- পায়ের নুপুর, হাতের চুড়ি, গলার মালা, স্বর্ণালঙ্কার প্রভৃতি।
কৃষ্ণের
পরনে থাকে ধুতি, মাথার চূড়ায় ময়ূরের পেখম ও লৈত্রেং, পায়ে নূপুর হাতে বাঁশী,
খাওনবী, বাহুতে খুনপ তাছাড়া নানারকম স্বর্ণালঙ্কার ও বর্ণাঢ্য আবরন।
শত
শত বৎসর ধরে মনিপুরী জাতিগোষ্ঠী বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে
সকলের সাথে ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রেখে এদেশে বসবাস করে আসছে। তারা এদেশে বিভিন্ন
সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অবদান রেখে চলেছে।
মুক্তিযুদ্ধেও দেশমাতৃকার স্বাধীনতার সংগ্রামে মনিপুরীরা অংশ নেয়। নিজেদের ঐতিহ্য
মন্ডিত সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি দেশের বাঙ্গালী সংস্কৃতিতেও রয়েছে তাদের
অংশগ্রহন। শুধু রক্ষণশীলতাকে তারা লালন করছে না, গৌরবময় বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে হৃদয়ে
ধারন ও লালন করে নিজেরা গৌরবান্বিত হয়েছে। সমাজের অগ্রগতি ও পরিবর্তনের ধারায়
মনিপুরীরাও আজ সামিল হয়েছে। মনিপুরী ও অপরাপর সম্প্রদায়ের অগনিত ভক্তবৃন্দের
উপস্থিতি ও সহযোগিতায় মহারাসলীলা সফল করার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোধের উজ্জ্বল
বহিঃপ্রকাশ ঘটবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন।
Tag :
রাসলীলা






0 Komentar untuk "মণিপুরী মহারাসলীলা প্রেক্ষিত"